সত্যাসত্য - সমাজ সাহিত্য ও দর্শন - হেমন্ত কুমার গঙ্গোপাধ্যায়

 সত্যাসত্য


মনীষী বার্ট্রাণ্ড রাসেলের একটা মন্তব্য নিয়ে আমাদের বক্তব্য আরম্ভ করা যাক–


“নিছক দার্শনিক হিসাবে বিচার করতে গেলে মাক্সের কিছু গুরুতর দুর্বলতা আছে। তিনি বড় বেশী বৈষয়িক, তার সমসাময়িক সমস্তা নিয়ে বড় বেশী ব্যতিব্যস্ত। তার দৃষ্টির প্রসার এই পৃথিবীর পর্যন্ত, এই গ্ৰহ আর মানুষ, এখানেই দর্শনের শেষ। কিন্তু কোপারনিক্যাসের পর থেকে একটি কথা পরিষ্কার বোঝা গেছে,–মানুষ এতদিন ধরে নিজের উপর যে গুরুত্ব আরোপ করে এসেছিল সেই বিশ্ববিসারী গৌরব আজ সে হারিয়ে ফেলেছে। যিনি এই ঘটনাটির মর্ম উপলব্ধি করতে পারেননি তাঁর পক্ষে নিজের দর্শনকে বিজ্ঞাননির্ভর বলে দাবী করার কোনো অধিকার নেই।”


-(History of Western Philosophy–Karl Marx)


রাসেলের বক্তব্য ব্যাখ্যা করলে অনেকটা এ রকম দাঁড়াবে–যে পৰ্যন্ত বিশ্বাস ছিল সূৰ্যটা পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে সে পৰ্যন্ত এই গ্রহবাসী মানুষের একটা যুক্তিসঙ্গত আত্মগরিমা ছিল। বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ড যেন তাকেই প্রদক্ষিণ করছে, সে ছিল বিশ্বের মধ্যমণি। কিন্তু পোল্যাণ্ডের এক পাদ্রীসাহেব কি কাণ্ড করে বসলেন, কলমের ডগায় সূৰ্যটাকে চেপে ধরে স্থির করে দাঁড় করালেন আর পৃথিবীটাকে ঘুরপাক খাইয়ে দিলেন সূর্যের চারদিকে। সৌরজাগতিক বিশ্বের সম্মানের আসনটি কেড়ে নিল একটা প্রাণহীন অগ্নিপিণ্ড। এই জ্বলন্ত গ্যাসপিণ্ডের চারদিকে আমরা আজ উদ্দেশ্যহীন বিরামহীনভাবে ঘুরে মরছি। মানুষ হয়ে মানুষের এমন সর্বনাশ করলেন কোপারনিকাস!


এখন বুঝতে পারছি মহাবিশ্বের তুলনায় আমাদের পৃথিবী একটি ধূলিকণা মাত্র, লুপ্তগৌরব হতবৈভব মানুষগুলি এই ধূলিকণার উপর ভাসমান কয়েক কোটি আণুবীক্ষণিক জীবাণুমাত্র। এই জীবাণুওগুলির ভিতরে অনেকেই নাকি আবার দার্শনিক বা বৈজ্ঞানিক। তারা ভাবছে তাদের দর্শন-বিজ্ঞানের ফরমান নিয়ে কোটি সূর্য তারায় ভরা ব্ৰহ্মাণ্ডটা ওঠবস করছে। রেলগাড়ীতে উঠে বাচ্চা ছেলে বাবাকে বিরক্ত করছে, গাড়ী চলছে না কেন? বাবা বললেন ধাক্কা দাও, চলবে। বালক সামনের বেঞ্চটাকে ধাক্কা দিতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পরে গাড়ী ছেড়ে দিল। বালক খুশী হয়ে ভাবেল তার ধাক্কার জোরেই গাড়ীটা নড়ে উঠে চলতে শুরু করেছে। জগৎটাও তেমনি দার্শনিক-বৈজ্ঞানিকের নীতির জোরে চলছে।


মাক্স নিরীশ্বরবাদী, কিন্তু মানুষের উজ্জল ভবিষ্যতের প্রতি তার বলিষ্ঠ বিশ্বাস অনেকটা ঈশ্বর-বিশ্বাসীদের পরা-ভক্তির মত। ভক্তের বিশ্বাস মঙ্গলময় ঈশ্বর শেষ পর্যন্ত মানুষকে মঙ্গলের পথে নিয়ে যাবেন। এখন ঈশ্বরের আসনে Dialectics বা দ্বান্দ্বিকাপদ্ধতিকে বসান হল। মানুষের কল্যাণকামনায় প্ৰদীপ্ত একটি অপূর্ব সংবেদনশীল হৃদয় ছিল মাক্সের, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রখর বুদ্ধিভাস্কর মনীষা। হৃদয় বলে মানুষের মঙ্গল হোক : কিন্তু মঙ্গল হবেই, হতে বাধ্য, এই ধরনের একটা প্ৰত্যয় বা দৃঢ় ধারণাশক্তি না থাকলে মানুষের মঙ্গলের জন্য নিরলস-ভাবে কাজ করবার উৎসাহ ও উদ্যম সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। তাই হৃদয়ের আবেগকে দর্শনবিজ্ঞানের যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। মাক্স ও তাই যুক্তি দাঁড় করালেন, দেখাবার চেষ্টা করলেন, জগৎজোড়া দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি সমাজবিবর্তনের মূলেও কাজ করছে। যে পদ্ধতিতে সূৰ্য-তারা-গ্ৰহভরা বিশ্বপ্ৰপঞ্চ চলছে তারই অমোঘশক্তি মানুষকেও এগিয়ে নিয়ে চলেছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় ভবিষ্যতের দিকে। মহাকাশময় গ্ৰহ-নক্ষত্রগুলি যেন সবাই উঠে পড়ে লেগেছে মানুষের ভাল করবার জন্য। না হলে আর জড় জগতের দ্বান্দ্ৰিক পদ্ধতিটা চেতন মানুষের সমাজকে এগিয়ে দেবার কাজে হাত লাগাতে এল কেন? এখানে তাহলে দর্শনের যুক্তিটা চলেছে হৃদয়াবেগের পিছনে পিছনে। মানুষের শুভ ইচ্ছাকে ফলবতী করতে হবে; কল্যাণকৰ্মে ব্যাপৃত একটি সংবেদনশীল মনীষী মন এই বলে নিঃসংশয় হল যে সমগ্র জগৎটাই চিরকাল ধরে দ্বান্দ্ৰিক উপায়ে এই পবিত্র কাজ সমাধান করার জন্যে সাহায্য করছে।


বার্ট্রাণ্ড রাসেলের মতে যিনি নিছক দার্শনিক তাঁর পক্ষে এজাতীয় কল্পনা অনুমোদন করা অসম্ভব। কারণ, এ হল অভীপ্সা-নির্ভর দর্শন। মানুষের মঙ্গল সম্পর্কে মাঝের একটা বদ্ধমূল ধারণা আছে। সেই ধারণাকে সমাজবাস্তবে রূপদান করতে হবে। তাই জগতের গতি ও কৃতিকৌশলকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হল যাতে কল্যাণময়ী অভীপ্সা চরিতার্থ হয়। “নিছক দর্শনের” দিক থেকে যে প্রশ্নটা বড় হয়ে দেখা দেয় তাকে এই ভাবে উপস্থিত করা যেতে পারে,–মহাবিশ্বের একটি ধূলিকণারূপিণী এই পৃথিবীর গায়ে লেগে থাকা কয়েক কোটি আণুবীক্ষণিক জীব, যাদের নাম মানুষ, যারা মহাকালের তুলনার মাত্র কয়েকদিন হল পৃথিবীতে এসেছে, তাদের ভাগ্য ফেরাবার জন্য সারাবিশ্বের বিধি-বিধানগুলি কাজ করে যাবে এমন কি দায় পড়েছে। গ্রহনক্ষত্রগুলির এমন কি মাথাব্যথা হয়েছে যে মানুষের ভাল না। হলে তাদের স্বস্তি নেই। নিউটন-আবিষ্কৃত মাধ্যাকর্ষণ নীতি মানুষের জন্য সমাজের আসরে নেমে বিপ্লবের কাজে হাত বাড়িয়েছে একথা যেমন একটি স্বচ্ছন্দ কল্পনা মাত্ৰ, তেমনি দুনিয়াজোড়া দ্বান্দ্ৰিক পদ্ধতি মানুষের সমাজে প্ৰতিফলিত হয়ে সমাজটাকে সাম্যবাদের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, এও একটা স্বৈরিণী ধারণামাত্র। এ জাতীয় কল্পনায় সুখ আছে, সাহস বাড়ে, উৎসাহের সৃষ্টি হয়, মানুষের অভীন্সিত সামাজিক লক্ষ্যে উপনীত হতে সাহায্য করে। জড় জগতের কোন লক্ষ্য নেই, উদ্দেশ্য নেই। মানুষ তার নিজের লক্ষ্য জগতের উপর আরোপ করে নিজের সীমিত উদ্দেশ্যের পথে এগিয়ে যায়। কিন্তু মানুষ মহাকাশে হাজারবার লক্ষ যোজন পাড়ি জমালেও শেষ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সূর্যের চারদিকে ঘুরে ফেরাই সার। যে কপাল নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে এসেছে সে কপাল নিয়েই তাকে ঘুরতে ফিরতে হবে; আর সূর্যের পোড়া কপাল, চিরকাল নিজের আগুনে নিজেকে পুড়ে মরতে হবে (যদি না একদিন ছাই হয়ে শেষ হয়ে যায়)।


মার্ক্সীয়দৰ্শন বিশ্ববীক্ষার দাবীদার, কিন্তু মুস্কিল বেঁধেছে মূলঘাটে, বিশ্বের তো নিজস্ব কোন বীক্ষা নেই। তাই মানুষের মননশীল মনে যে বীক্ষণশক্তি স্থান পেয়েছে সেটাই বিশ্ব-বীক্ষা, এমন দাবী করলে মানবকেন্দ্ৰিক দর্শন পরিতৃপ্ত হতে পারে। কিন্তু এও এক ধরনের আত্মরতিময়ী পরিতৃপ্তি যার ভিতরে লুকিয়ে আছে এক পরম স্পৰ্থ-আমিই বিশ্ব। এ যেন অদ্বৈতবেদান্তেরই প্ৰতিধ্বনি, “সোহম”-বাদের এক নবরূপী সংস্করণ। কিন্তু নিখিল জগতের কোটি কোটি বছর ধরে এই যে বিরামহীন কালক্ষয়ী কালপরিক্রমা, এর ত কোন লক্ষ্য নেই, উদ্দেশ্য নেই, মূল্য নেই। তাই জগতের অণুতম ভগ্নাংশ যে মানুষ তারও কোন চরম মূল্য নেই, চুড়ান্ত সার্থকতা নেই। একই কারণে মানুষের কোনো বিশ্ববীক্ষণের ক্ষমতা নেই। তার বিশ্ব-দৃষ্টি আত্মদৃষ্টিরই নামান্তর মাত্র-একটি ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশের পক্ষে সুবিপুল সমগ্রতাকে ধারণ করা ও ধারণা করা অসম্ভব।


এত কথা বার্ট্রাণ্ড রাসেল বলেন নি। রাসেলের বক্তব্যের একটি বিস্তৃত ব্যাখ্যা আমরা এমন ভাবে উপস্থিত করলাম যাতে “মানবকেন্দ্ৰিক” মাক্সীয় দর্শনের বিরুদ্ধে “বিশুদ্ধ দর্শনের” আপত্তিটা বেশ জোরদার বলে মনে হতে পারে।


।।দুই।।


বিশুদ্ধদৰ্শনের মতে সত্যাসত্য মানুষের শুভাশুভ-নিরপেক্ষ। একদিন সমুদ্রের নাবিকরা ধ্রুবতারা দেখে দিকৃনির্ণয় করত। কিন্তু দিশাহারা নাবিককে দিগদর্শন করাবার জন্য ধ্রুবতারাটা কোন ব্ৰত গ্ৰহণ করে আকাশে ওঠেনি। এখন নাবিকের পক্ষে সে নিষ্প্রয়োজন, তাতেও তার কোনো আপশোস নেই। তবু তার অস্তিত্বটা সত্য যা মানুষের ভালমন্দর কোনো তোয়াক্কা রাখে না। এই হল দার্শনিক সত্য বা বৈজ্ঞানিক সত্য যা মানুষের আপন মনের রঙে রাঙানো নয়, অথচ মানুষ যাকে আপনি কাজে লাগালেও


লাগাতে পারে।


কিন্তু যে দর্শনের মূল লক্ষ্য মানুষ সেই মানবকেন্দ্রিক দর্শনের শেষ পর্যন্ত আত্মকেন্দ্রেইক ওঠার সম্ভাবনা আছে। কারণ এ হল মানুষেরই আত্মদর্শন। তা হলে বহুবিঘোষিত বস্তুবাদ যখন মানবতাবাদে পর্যবসিত হয় তখন দার্শনিক সত্যদৃষ্টি থেকে তার বিচ্যুতি ঘটেছে বলতে হবে।


গ্ৰীক দর্শনের সোফিস্ট সম্প্রদায়ের পূর্বতম সুরি প্রোটাগোরাস একটি বহুজন-বিদিত প্রবাদের জন্য অমরত্ব লাভ করেছেন -“যা কিছু আছে আর যা কিছু নেই, কি আছে আর কি নেই, এই সব কিছুরই মাপকাঠি হল মানুষ।” (Man is the measure of all things, of things, that are that they are, and of things that are not that they are not). First এই উক্তিটির মর্মার্থ একটি বৃহত্তর মানবতাবাদী তাৎপর্ধে রূপান্তরিত হয়েছে“সবার উপরে মানুষ সত্য”, এই মহত্তর মানবিক বাণী-ভাবনার সহিত একাত্মতা লাভ করেছে। প্রোটোগোরাসের প্রবাদবাক্যটি যে মহিমাময় অর্থে আমরা বর্তমানে ব্যবহার করছি, মূলত হয়ত সে অর্থ তার ছিল না। প্লোটোর সমালোচনায় একথাটির যে অর্থপ্রকাশ পেয়েছে তাকে মানুষের উল্লসিত হবার কোনও কারণ ঘটেনি। “সব কিছুরই মাপকাঠি মানুষ।” একথাটির প্লেটো অর্থ করেছেন-যার কাছে যখন যা প্ৰতিভাত হয়, তার কাছে তখন তাই সত্য। কামলারোগী যখন সাদাকে হলুদ দেখে তখন তার কাছে হলুদ রঙটাই সত্য, যে সাদা দেখে তার কাছে সাদাটাই সত্য। সুতরাং সত্যাসত্য শেষপর্যন্ত মানুষের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যাপার মাত্র। এর সহজ অর্থ হল, মানুষের দৃষ্টিনিরপেক্ষ নিছক বস্তুগত সত্যাসত্য বলে কিছুই নেই। কাজেই সত্যমিথ্যার স্বগত-পার্থক্য নির্ধারণের ও কোনো উপায় নেই। সক্রেটিসের মুখ দিয়ে প্লেটো এই মতবাদের বিরুদ্ধে যে সমালোচনা শুরু করলেন তার যুক্তিসিদ্ধ নির্দোষ ব্যঙ্গরসাটুকুও যথেষ্ট উপভোগ্য সন্দেহ নেই।


প্লেটোর সক্রেটিস বলছেন-প্রোটাগোরেসের বইখানা খুলেই আমি খুশী হয়েছি, যখন দেখলাম তিনি বলছেন—যার কাছে যা প্রতিভাত হয় তাই সত্য। তবুও আমি একটা কথা ভেবে বিস্মিত হচ্ছি, প্রোটাগোরাস আর একটু এগিয়ে গিয়ে কেন বললেন না—“সব কিছুরই মাপকাঠি শুয়োর বা বেবুন বা ব্যাঙাচি”। বিদ্রুপটির মর্মার্থ পরিষ্কার। মানুষের কাছে যা প্ৰতিভাত তা যেমন মানবিক সত্য, ব্যাঙাচির কাছে যা প্ৰতিভাত ত। ব্যাঙাচির সত্য। ব্যাঙাচির চেয়ে মানুষকে বিজ্ঞতার বলে মনে করার কোনও কারণ নেই। (Plato–Theaetetus)


এখন মনে করুন, বিশ্বরহস্যের অতল গভীরতা ও অন্তহীন বিপুলতায় অভিভূত হয়ে কোনও বিনয়বিহ্বল দার্শনিক যদি ভাবতে শুরু করেন-হায় মানুষ, তোমার কিসের গৌরব, কিসের গর্ব, অনন্তের তুলনায় তুমি ব্যাঙাচির চেয়ে বড় নও, তাহলে এই ব্যাঙাচি-ভাববিভোর দার্শনিকের ভাবনার তাড়না থেকে আণনি উদ্ধার পাবেন কি করে? উদ্ধার পাবার দুটি রাজপথ অনেকদিন থেকে তৈরী হয়ে আছে। বিশ্বের রহস্য যেখানে দুৰ্গম ও দুর্ভেদ্য বলে মনে হবে, সিএ গভীর শূন্যময় অন্ধকূপে এক সর্বজ্ঞা, সর্বিনিয়ন্তা নিত্যভাস্বর পরমেশ্বরকে বসিয়ে দিন, আর ভাবুন তার আলোতে আলোময় এ বিশ্বভুবন-তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি। ভাবুকের ভাবনা রবারের মত টানলে বাড়ে। তাই ক্ষমতা থাকলে আরও ভাবুন, ভাবুন তিনিই আছেন, আর কিছু নেই, আরো ভাবুন আপনিই তিনি। এখন আর আপনি “তৃণাদপি সুনীচ” নন। জগতের জয়টীকা আপনার ললাটে। অনন্ত গৌরবে প্ৰদীপ্ত আপনি বিশ্বের পরম বিস্ময়। এখন জলের মত সব ব্যাখ্যা ইয়ে গেল, সকল রহস্তের সমাধান হয়ে গেল, হৃদয়ের সকল গ্ৰন্থি খুলে গেল, সকল সংশয় কেটে গেল।


কিন্তু আপনি তো এক ভাবনায় সব নিরাময় করে দিলেন। এদিকে সক্রেটিসের শুয়োর, বেবুন আর ব্যাঙাচিগুলিও তো রয়েছে। ওরা কি আপনার মত ভাবতে জানে? ভাবুকের ভাবের ঘরে পরমেশ্বর, আর শূকরের মুখগহ্বরে পঞ্চামৃত, দুয়ের কাছে দুটাই পরম সত্য। মানুষ ও শুয়োর যদি এক সঙ্গে সত্যদৃষ্টির দাবিদার হয়, তবে কোন হাকিম রায় দেবার সাহস করবে বলুন। ভাগ্যে শুয়োরের বুদ্ধি নেই তাই কোন দার্শনিকের আদালতে হাজির হয়নি; অথবা তার বুদ্ধি একটু বেশী, বুঝেছে যে মানুষ যখন নিজেই মামলার শরিক তখন তার বিচারের ওপর নির্ভর করা বৃথা, তাই নির্ভাবনায় কাঁদার গড়াগড়ি দিয়ে কসাইখানায় চলে যাচ্ছে।


কিন্তু শূকর জানে না যে মানুষের মধ্যেও নিরপেক্ষ দার্শনিক আছেন। আপনি যদি ফরাসী দার্শনিক বার্গসঁর শিষ্য হন তবে কিন্তু শূকরের দিকেই সত্যনারায়ণের পাল্লা ভারী হবার সম্ভাবনা আছে। বাৰ্গসঁর মতে মানুষের বিচারবুদ্ধি তার একটা দুৰ্ভাগ্য; এই বিচারবুদ্ধি বা intellect এর কাছে মানুষের স্বাভাবিক অনুভবশক্তি বা instinct হার মেনে আত্মগোপন করেছে। জগতের মূল সত্য একটা দুরন্ত দুনিবার জীবনীশক্তি যার নিরন্তর গতিশীল স্বরূপটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির অগোচর। বুদ্ধির ধর্মই হল জগৎটাকে খণ্ড খণ্ড করে স্থিরভাবে দেখা। একমুহূর্তও যে থমকে দাঁড়ায় না বুদ্ধি তাকে ধরবে কি করে। তাই মানুষ তার বুদ্ধির দৌলতে জড়জগৎ সৃষ্টি করেছে। যা গতিশীল হলেও মানুষ তার গতিক্ষণগুলোকে ভাগ ভাগ করে বিশ্লেষণ করে দেখতে চায়। এই খণ্ড খণ্ড স্থির বস্তুপিণ্ডগুলিই বুদ্ধির একমাত্র পুঁজি। তাই জ্যামিতি বিন্দু সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞান অণু পরমাণু সৃষ্টি করেছে। একদিন যে আলোককে শক্তির তরঙ্গ বলে জানতাম তার ভিতরেও বিচ্ছুরিত কণিকা সমষ্টি আবিষ্কার করেছে। আসল কথা গতিশক্তির একটা আধার না থাকলে মানুষ গতির কল্পনা করতে পারেনা, আর আধারটি যদি অন্তত একটিীক্ষণ স্থির না থাকে। তবে তাকে আধার বলে চেনা যায় না, কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু বার্গসঁর মতে শক্তির আধার বলে কিছু নেই, গতিশীল বস্তু বলে কিছু নেই। আছে শুধু একটা বস্তুহীন ধাবমান গতিশক্তি যার নাম জীবন। তাই বস্তুপূর্ণ জড়জগৎ বুদ্ধির কল্পনাবিলাস মাত্র। আলোর, গতি সেকেণ্ডে একলক্ষ ছিয়াশী হাজার মাইল-একথা বলাও বুদ্ধিবিকারের লক্ষণ মাত্র। কারণ ঐ পরিমাপটাও একটা স্থির গাণিতিক সংজ্ঞা। যে সত্য অখণ্ড অপরিমেয় তাকে যত সূক্ষ্ম করে মাপার চেষ্টা করা হবে ততই তাকে খণ্ড খণ্ড করে বুঝতে হবে, আর ততই বুদ্ধি সত্যভ্ৰষ্ট হবে। গণিতশাস্ত্ৰ শেষ পর্যন্ত পরিমাপের বিজ্ঞান, তাই সে অমেয়কে মাপার স্পর্ধ রাখে, কতকগুলি স্থির সংজ্ঞার দ্বারা অস্থির জীবনকে বাঁধতে চায়।


তাহলে উপায় কি, সত্যকে জানিব কি করে? জানা যায় না। অনুভব করা যায়, বুদ্ধির বিকারমুক্ত নির্লিপ্ত স্বাভাবিক অনুভব শক্তির দ্বারা উপলব্ধি করা যায়। মানুষের বিচারবুদ্ধি উপলব্ধিকে কোণঠাসা করে রেখেছে। সেই উপলব্ধিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। পিছন দিকে তাকালে দেখা যাবে। আমরা এই উপলব্ধির পরম ঐশ্বৰ্য ফেলে রেখে এসেছি ইত্যর প্রাণী-জগতের অনুভূতি বা ভাণ্ডারে। ইত্যর প্রাণীদের ভিতরে বুদ্ধি ও অনুভূতির ব্যবধান ক্ৰমশঃ দূর হয়ে গেছে, আর আমরা যত ওপরের দিকে উঠেছি ততই ব্যবধানটা বেড়ে গেছে। উন্মাৰ্গগামী বুদ্ধির যে দৌরাত্ম্য দেখা গেল বানরের মধ্যে, মানুষের মধ্যে এসে তা উৎকটরূপে পরিপূর্ণ হল। উপলব্ধির সঙ্গে বুদ্ধির দূরত্ব এতখানি বেড়ে গেল, এমন সর্বগ্রাসী প্ৰতাপ নিয়ে বুদ্ধি আবিভূতি হল যে বেচারা উপলব্ধি মনের অতল গহবরে ভয়ে নিজীব নিঃসার হয়ে পড়ে রইল। কিন্তু ইত্ন প্রাণীর বিচারবুদ্ধি দুর্বল, তাই অনুভূতিটাই প্ৰবল। পিপড়া, মৌমাছি বা উইপোকার দিকে তাকান, তাক-লাগামো এত সুন্দর সুন্দর কাজগুলি তারা বিচার বিশ্লেষণ করে করছে না, করছে স্বচ্ছ স্বাভাবিক অনুভব-প্রবণতার ক্ষমতায়, যে ক্ষমতা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে প্ৰযুক্ত হয় না, অথচ যা জীবনীশক্তির স্বাভাবিক বিকাশ ধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নিরুদেশে, নির্বিচারে কাজ করে চলে। মানুষের সুপ্ত অনুভূতিকে প্রথম যুগের গৌরবের ভূমিকাটি ফিরিয়ে দিন, তাকিকের বুদ্ধিকে স্তব্ধ করে রাখুন, সত্যের চিরভাস্কর গতিময় স্বরূপটিকে উপলব্ধি করুন।


তাই বলেছিলাম, বার্গসঁর শিস্য হলে শূকরের দিকে সত্যানুভূতির পাল্লা ভারী হবার সম্ভাবনা আছে, কারণ ওর ভিতরে নিছক জীব-সহজাত অনুভূতি ছাড়া আর কোন বুদ্ধির তাড়না কল্পনা করা যায়না। কিন্তু শূকরের কাছে সত্যদৃষ্টি শিখতে বললে মানুষের অপমানিত ৰোধ করা স্বাভাবিক। অত কদাকার চেহারা, আর অত বদভ্যাস বরদাস্ত করা অসম্ভব। খাবার টেবিলে ভোজনরসিকের শ্ৰীতি জন্মালেও হরিজনের বস্তিতে পঙ্ককেলিনিমগ্ন ওর দৃষ্টি মোটেই মনকে প্ৰসন্ন করে না। সুতরাং আমরা মৌমাছিকেই সত্যদ্রষ্টা ঋষি বলে ধরে নেব, কবি-মানুষের মনও আনন্দিত হবে, এদের নিরলস নিরুদেশ ও নির্বিচার নির্মাণ-কৌশলে দার্শনিক দৃষ্টিও বিমুগ্ধ হবে।


।।তিন।।


কিন্তু সক্রেটিসের শূকর এত সহজে আমাদের ছাড়বে কেন? কথায় বলে শুয়োরের গোঁ। তারপর অতবড় দার্শনিকের কাছ থেকে কিছু বুদ্ধি ধার করে সে ও তর্ক জুড়ে দিতে পারে, বলতে পারে,–বাৰ্গসঁ তো বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করেই বুঝিয়েছেন যে বুদ্ধির দ্বারা সত্যকে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় নিছক অনুভূতির দ্বারা। তাহলে শেষ পর্যন্ত ঐ হ’ল-মানুষের বুদ্ধিতে যা প্রতিভাত তা মানবিক সত্য, তার কাছে—“Man is the measure of all things.” তবে আমার কাছে “The measure of all things is the pig” (Plato–Theaetetus), এ আমার ‘শৌকরিক’ সত্য। এখন দার্শনিকের উপায় কি? উপায় বাতিলালেন ‘William James, যিনি ব্যবহারবাদ বা Pragmatism-এর প্রধান আচার্য বলে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। তিনি বললেন।–একদিকে চেতন মানুষের ধারণা-নিরপেক্ষ একটা বহির্বিশ্ব, আর একদিকে তার ধারণা, এই দুইয়ের ভিতর মিল থাকার নামই সত্য-সত্যের এ জাতীয় সুকঠোর সংজ্ঞা নির্ধারণ করেই দার্শনিকেরা বিপদে পড়েছেন। এই মিলটা কোথা আছে কি নেই এ বিষয়ে কিছুই নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই, অন্ততঃ মিলাটা যে কোথাও আছেই এমন নিশ্চিত কোন প্ৰমাণ খুঁজে বার করা অসম্ভব। এখানে বিজ্ঞানবাদীদের যুক্তি যেমন সূক্ষ্ম তেমনি সুদৃঢ়। আমার চেতনার বাইরে গিয়ে আমি বাহিরকে জানতে পারি না। অথচ বাহিরকে চেতনার আলোতে স্নান কারাবার আগেই তাকে না জানলে তার সঙ্গে চেতনার মিল খুঁজব কেমন করে? মিল খুজতে গেলে যার সঙ্গে মিল তাকে আগে জানা চাই, অথচ জানতে গেলে মিল চাই, নৈয়ায়িকের পরিভাষায় এই অন্যোন্যাশ্রয় দোষ থেকে মুক্তি পাওয়া মুস্কিল। সুতরাং জেমস্ ঠিক করলেন -জ্ঞান ও জ্ঞেয়ের ভিতরে সামঞ্জস্যের নাম সত্য, সত্যের এই সংজ্ঞাটিকে পরিত্যাগ করে নূতন কোন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা উচিত।


জেমস্ সত্যের নূতন সংজ্ঞা প্রণয়ন করলেন- “কোনও ধারণার উপর বিশ্বাস রাখা যে পৰ্যন্ত আমাদের জীবনের পক্ষে লাভজনক, সে পৰ্য্যন্ত সেই ধারণাটাই সত্য।” “শেষ পৰ্যন্ত এবং সামগ্রিকভাবে যে ধরণের ধারণা


আমাদের সুবিধাজনক। তাই সত্য।” “যদি কোনও আপাতসিদ্ধ ধারণা থেকে জীবনের পক্ষে কার্যকর সুফল পাওয়া যায়। তবে আমরা তা বর্জন করতে পারি না।” জেমস এর ব্যাখ্যা করতে ঈশ্বরের উদাহরণ টেনে আনলেন। ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করার যদি ব্যাপকতম অর্থে কোনও সন্তোষজনক কাৰ্যকারিত থাকে তাহলে ঈশ্বর সত্য। জেমসের মতে এই কাৰ্যকারিতা আছে, তাই ঈশ্বরের ধারণা সত্য। “আধ্যাত্মিক অনুভূতির প্রমাণের উপর নির্ভর করে আমরা অনায়াসে বিশ্বাস করতে পারি। যে এমন একটা উচ্চ পৰ্যায়ের শক্তি আছে যা আমাদের ধ্যানধারণার সাথে সঙ্গতি রেখে জগৎটাকে উদ্ধার করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।”


সত্যের এই অভিনব সংজ্ঞায় ইত্যর প্রাণীদেরও আপত্তির কিছু নেই। আমরা তাদের বুঝিয়ে বলতে পারি।–তোমাদের পক্ষেও যা ভাল বা কার্যকর তাই তোমাদের সত্য।


তবু মানুষের ন্যায়শাস্ত্র জেমস-প্ৰদৰ্শিত সমাধানের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি তুলবে। প্ৰথম আপত্তি, সত্যাসত্যের-বিচারে আমাদের ধারণার অনুরূপ বহির্জগতে কোন বস্তু বা ঘটনা আছে কি নেই জেম্স এই মূল প্রশ্নটি একেবারেই এড়িয়ে গেছেন। অথবা এ প্রশ্নটিকে তিনি কোনও প্রশ্ন বলেই স্বীকার করেন নি। ঈশ্বর আছে কি নেই সেটা আসল কথা নয়, আসল কথা হল ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখলে আমাদের পক্ষে ভালভাবে কাজ। উতরে যায়। কিনা। যদি দেখা যায় দিব্যি কাজ চলে যাচ্ছে। তাহলেই বিশ্বাসটা সত্য, তিনি থাকুন। আর নাই থাকুন। কিন্তু বিশ্বাস না রেখেও যাদের কাজ উতরে যায় তাদের বেলা ঈশ্বরের গতি কি হবে?


আমাদের দেশের মীমাংসা-দর্শনে দুটি প্রধান কথা আছে, বিধি ও অর্থবাদ। বিধি হল অভীষ্ট-সিদ্ধিকর কোন কার্যে নিযুক্ত করার জন্য কোন আদেশ বা উপদেশ (অথবা কোন নিদিষ্ট কাজ থেকে নিবৃত্ত করার জন্য)। অর্থবাদ হ’ল আদেশটা মানতে যাতে লোকে অনুপ্রেরিত হয় এমন কোন আনুষঙ্গিক স্তুতি বা কাহিনী। মনে করুন ছোট্ট ছেলে তেতো ওষুধ খেতে রাজী নয়। মা তাড়াতাড়ি পঞ্জিকার পাতা খুলে এক মস্ত পালোয়ান এনে হাজির করলেন, বললেন, দেখি খোকা কি লিখেছে; এই ওষুধ খেয়ে অত বড় পালোয়ান হয়েছে লোকটা। ছেলে পালোয়ানের দিকে তাকিয়ে ওষুধটা খেয়ে ফেলল। জেমসের মতে তা হলে পঞ্জিকার পালোয়ানটা সত্যিই পালোয়ান, কারণ সে ছেলের মায়ের কাজটা ভালমতেই হাসিল করে দিয়েছে। ওষুধের বিজ্ঞাপনদাতাও কিন্তু জেমসের মত পালোয়ানে বিশ্বাস করে না। আমাদের দেশের দার্শনিকরাও অর্থবাদ-বাক্যগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে সত্য বলে মনে করেন না। বিধিবাক্যগুলির প্রমাণ্যের পুচ্ছ ধারণ করেই অর্থবাদ বাক্যগুলি ধার করা প্রামাণ্য লাভ করেছে। চাপরাসীর চাপরাস মূলত মালিকের মহিমাই কীর্তন করে। জেমসের মতে কিন্তু অর্থবাদগুলো খাটি সত্য হতে বাধ্য, কারণ ওগুলো কাৰ্যসিদ্ধিকর। আমাদের দেশের এক দিকৃপাল প্ৰাচীন দার্শনিক এমন কথা বলেছেন যে স্বৰ্গ-নরকে বিশ্বাসী অনেক ধাৰ্মিক লোকের মর্মাহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। ছেলে কাঁদছে, মা বলছেন, কেঁদো না, কাঁদলে বাঘে খাবে, ছেলে ভয়ে ভয়ে কান্না থামিয়ে দিল। পাপ করলে নরকে যেতে হবে, এই নরকবাসটাও ঐ কান্না থামানো বাঘের মত। ওটা সত্য নয়, কিন্তু দরকারী, কারণ পাপ থেকে নিবৃত্ত করতে সাহায্য করে। এ কথাগুলো বলেছেন স্বয়ং ভর্তৃহরি–


“ব্যাঘ্রাদিব্যপদেশেন যথা বালো নিবর্ত্যতে।

অসত্যোহপি তথা কশ্চিৎ প্রত্যবায়ো বিধীয়তে।।”

(ভর্তৃহরি—বাক্যপদীয়—দ্বিতীয় কাণ্ড)


ভর্তৃহরি যাকে অসত্য বলে ঘোষণা করলেন, জেমসের মতে কিন্তু তা সত্য, কারণ বাঘের ভয়ে কান্নাটা থামল তো!


জেমসের “সত্য-সংজ্ঞার” বিরুদ্ধে দ্বিতীয় আপত্তিটাও কম জোরালো নয়। জেমস সত্যের ধারণাকে একটি নৈতিক ধারণার (ethical concept) সঙ্গে একাকার করে ফেলেছেন। তিনি যে কাৰ্যসিদ্ধির কথা বলেছেন স্বভাবতই তা ইষ্টসিদ্ধি, অনিষ্টসিদ্ধি নয়; মানুষের যাতে মঙ্গল হয়, ভাল হয় তাই সত্য। এখন মনে করুন, পরিবারের একমাত্র উপাৰ্জনশীল ব্যক্তিটিকে ওলাইচণ্ডী দেবী দয়া করলেন। এখন এই ঘটনাটি কার ইষ্টসিদ্ধি করবে? পরিবারের পক্ষে এ ঘটনাটি (দার্শনিকমতে ধারণাটি) মর্মান্তিক সত্য। কিন্তু জেমসের সংজ্ঞানুসারে ঘটনাটি মিথ্যা হতে বাধ্য, কারণ কলেরা রোগটা তো সন্তোষজনক-ভাবে কারুর কার্যসিদ্ধি করছেন। সুতরাং রোগীকে হাসপাতালে পাঠানোরও কোন প্রয়োজন নেই, কারণ রোগের ধারণাটাই মিথ্যা। আমাদের দেশের হাসপাতাল-কর্তৃপক্স ও জেমসের সত্যদর্শনে অনেকটা স্বস্তিবোধ করবেন।


William James—এর সমালোচনা আমরা সাধারণ ভাবেই উপস্থিত করলাম, বিশেষভাবে মাক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে নয়। মাক্সর্বাদের তরফ থেকে সমালোচনা অনেকদূর পর্যন্ত যেতে পারে। কিন্তু কোনও অ-মার্ক্সীয় বিশুদ্ধ দার্শনিক আপত্তি তুলতে পারেন যে সত্যাসত্য বিচারে জেমসের লেখার ভিতরে অনাবশ্যক ও দুর্ভাগ্যজনক কতগুলি শব্দ স্থান পেয়েছে–যেমন practical cash-value, payments, that which pays ইত্যাদি, এবং এই শব্দগুলি দেখেই মাক্সবাদীরা বিভ্রান্ত হয়ে জেমসের দর্শনের সঙ্গে মার্কিনীপুঁজিবাদের একটা সঙ্গতি আবিষ্কার করেছেন।


।।চার।।


অবশ্য জেমসের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারী Dr. Dewey-র মতবাদকে যিনি মার্কিনী শিল্পসভ্যতার সাগরেদ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি মোটেই মার্ক্সবাদী নন, তিনি হলেন স্বয়ং বার্ট্রাণ্ড রাসে। রাসেলের মন্তব্যের বিরুদ্ধে Dewey-র পাণ্টা মন্তব্যটিও উল্লেখযোগ্য-“মার্কিনী শিল্পসভ্যতার ন্যকারজনক বৈশিষ্ট্যগুলির সাথে pragmatic মতবাদের একটা সম্পর্ক স্থাপন করা রাসেলের একটা সুনিশ্চিত অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে, আমি যদি তার দার্শনিক মতের সঙ্গে বিলাতী অভিজাত জমিদারশ্রেণীর স্বার্থের কোনও সম্পর্ক খুঁজতে যাই তবে তাও তেমনি অদ্ভুত শোনাবে নাকি”? রাসেল প্ৰত্যুত্তরে বললেন,–“ব্রিটিশ অভিজাতশ্রেণীর সহিত সম্পর্কের প্রভাবে আমার মতামত গড়ে উঠেছে, এ রকমের ব্যাখ্যা শুনতে আমি অভ্যন্ত, বিশেষ করে কমিউনিস্টদের কাছ থেকে। তবু একথা মেনে নিতে আমার মোটেই অনিচ্ছা নেই যে আমার মতামত অন্য সকলের মতামতের মতই সামাজিক পরিবেশের দ্বারা প্ৰভাবান্বিত।”


Dewey-র মতে পারিপাশ্বিকের সাথে সামঞ্জস্য-বিধান বা খাপ খাইয়ে নেবার জন্য জীবশরীরের যে অক্লান্ত প্ৰচেষ্টা তারই নাম সত্যানুসন্ধান। কাজেই সত্য এবং অনুসন্ধান দুটি পৃথক ব্যাপার নয়, সমগ্ৰ অনুসন্ধান প্রক্রিয়াটিই গতিশীল সত্য। প্ৰকৃতির কোলে জন্মগ্রহণ করা থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ সব সময়ই এই সামঞ্জস্য-বিধানের আবিরাম চেষ্টা করছে। প্ৰতিকুল পরিবেশ নিরন্তর সমস্যা সৃষ্টি করে চলেছে। সমস্যা সমাধানের জন্য মানুষ নিজকে পরিবেশের উপযোগী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে, সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশকেও নিজের উপযোগী করে গড়ে তুলেজে। ফলে পুরাতন ধারণার জায়গায় নূতন ধারণার আবির্ভাব ঘটেছে। প্রাচীন যাদুবিদ্যার প্রতিজ্ঞাবাক্যগুলির স্থান গ্ৰহণ করেছে আধুনিক বিজ্ঞানের সুপরীক্ষিত প্ৰতিজ্ঞাসমূহ। কিন্তু সামগ্রিকভাবে মানুষের সমস্যার শেষ সমাধান বলে কোন কথা নেই। নিত্য নূতন পারিপাৰ্থিকে সঙ্গে নূতন সামঞ্জস্য-বিধানের সমস্যা তাকে কোনদিনই রেহাই দেবে না। কাজেই জীবক্ৰমাগত গতিশীল সত্যের প্রলম্বিত প্রক্রিয়াটিও বীর হনুমানের দেহের মত ক্ৰমশঃ লম্বা হয়ে চলবে। ”


‘গতিশীল’ কথাটা আজকাল খুবই জনপ্রিয় সন্দেহ নেই। এমনকি আমাদের রাষ্ট্রনায়করাও জনমানসে নিজেদের স্থিতি সুনিশ্চিত করার জন্য যত্রতত্র বক্তৃতায় কয়েকবার ‘গতি’-শব্দটি ছড়িয়ে রাখেন। হয়তো দুৰ্গতিটাও একরকমের গতি। চিন্তানায়ক Dewey সাহেব সত্যের যে গতিময় রূপটি আবিষ্কার করলেন তার ভিততেও দুর্গতির দুর্ভোগটা নেহাত কম না। একটি বহুপ্রচলিত গল্প অনেকেরই জানা আছে। বর্ষার দিনে ছাত্র স্কুলে আসতে দেরি করেছে। মাষ্টারমশাই জিজ্ঞাসা করলেন-দেরি হ’ল কেন? ছাত্র বললে-কি পিছল পথ, এক পা এগোই তো দুপা পিছিয়ে যাই। মাষ্টারমশাই আবার জিজ্ঞাসা করলেন-তবে স্কুলে এসে পৌঁছলে কি করে? চতুর ছাত্র বলল, মুখ ঘুরিয়ে বাড়ীর দিকে যাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু অঙ্কশাস্ত্রের নিয়মে স্কুলে এসে পৌঁছলাম। ছাত্রটির গণিতের জ্ঞান যেমন নির্ভুল, Dewey প্ৰণীত সত্যের সংজ্ঞা ও তেমনি নির্ভেজাল। পারিপাশ্বিকের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য জীবশরীরের অবিরাম প্রচেষ্টাকেই যদি সত্যের সংজ্ঞা হিসাবে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে বলতে হবে, প্ৰচেষ্টা যখন সার্থক হল তখন পূর্বকৃত ধারণাটি সত্যে পরিণত হল, অর্থাৎ সত্যের প্রক্রিয়ার সাময়িক পরিসমাপ্তি ঘটল। এইভাবে সত্যে পরিণত হওয়া মানেই সত্য প্ৰমাণিত হওয়া। সত্যরূপে পরিণতিই হল সত্যের প্রমাণ।। ব্যাপারটা এরকম নয় যে, আগ থেকেই একটা কিছু সত্য ছিল যাকে এখন আমরা প্রমাণের ভিতর দিয়ে জানলাম। সামঞ্জস্যবিধানের প্রচেষ্টা শুরু হওয়ার আগে সত্যমিথ্যা কিছুই ছিল না। এই প্রচেষ্টার প্রারম্ভই হল সত্যের সূতিকাগার।


জেমস সত্যের যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছিলেন তার সংস্কার সাধন করতে গিয়ে Dewey যে তত্ত্ব আমদানী করলেন তাতে জেমসের মূলনীতির বিশেষ কোন পরিবর্তন হল না। যা আখেরে সন্তোষজনক-ভাবে কাৰ্যকর। তাই সত্য-Truth is that which is useful in the long run, এই সংজ্ঞাটির সহজবোধ্য রূপটিকে একটি সুগম্ভীর শব্দসম্ভারে ঢেকে দিয়ে মূলত ঐ একই অর্থে তিনি একটি নতুন সংজ্ঞার আমদানী করলেন। জেমসের ভাষার অপূর্ব প্রসাদগুণ এবং সাহিত্যিক সৌন্দৰ্য সযত্নে বর্জন করে Dr. Dewey সত্যের একটা পালোয়ানী সংজ্ঞা দিলেন–Warranted Assertibility, যার এক কথায় বাংলা তর্জমা করা আমার পক্ষে অসাধ্য। কিন্তু পালোয়ানী দর্শনকেও কায়দা করে জল করে দেয়ার কৌশল বোধ হয় রাসেলের মত আর কারুক্স জানা নেই, তাই আমরা তায়ই শরণাপন্ন হলাম। কোন নির্দিষ্ট ধারণার অনুরূপ একটি বিশেষ প্ৰতিজ্ঞাবাক্যের নাম দেওয়া যাক assertion। ধরুন “শীতলা পূজা দিলে বসন্ত রোগ হয় না।” একটি প্রতিজ্ঞা-বাক্য। এখন এই প্ৰতিজ্ঞাবিধৃত ধারণা অনুসারে কাজ করলে যদি সুফল পাওয়া যায়। তবে প্ৰতিজ্ঞা বা ধারণাটি সত্য। তাহলে অভীষ্টসাধনার দ্বারা কোন ধারণা যদি যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হয় অর্থাৎ warranted হয়, জেমসের সহজভাষায় ইষ্টসিদ্ধির দ্বারা ধারণাটির উপযোগিতা যদি প্ৰমাণিত হয়, তখন ঐ ধারণার অনুরূপ প্ৰতিজ্ঞা-বাক্যটিও সত্য বলে প্রমাণিত হল। সুতরাং সত্য মানে “warranted assertibility”। এখন এই গম্ভীর সংজ্ঞাটির একটি গম্ভীর ব্যাখ্যা করে বলা যাক-সত্য মানে একটা স্থিরনিশ্চয় নয়। সত্য হল একটা কার্যকরী প্রক্রিরা-ইষ্টসিদ্ধিমূলক ব্যবহারিক কাৰ্য দ্বারা কোন প্ৰতিজ্ঞাবাক্য উপযোগী বলে বিবেচিত হওয়ার এই যে প্রক্রিয়া এরই নাম সত্য। সঙ্গে সঙ্গে সহজকে কঠিন করে বলার একটা পণ্ডিতী প্ৰক্ৰিয়ার নিদর্শনও আপনার পেলেন। আবার দেখুন, বহুবর্ষের অভিজ্ঞতার দ্বারা দেখা গেল শীতলা পূজা দিয়ে বসন্ত রোগ ঠেকানো যায় না। সমস্যাবিব্রত মানুষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বসন্তের টীকা আবিষ্কার করল। এই সার্থক প্ৰতিষেধক প্ৰাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে সত্যবাহিকা প্রক্রিয়াটিও অনেক দূর এগিয়ে গেল। “শীতলা পূজা বসন্তের প্রতিষেধক” এই মূল প্ৰতিজ্ঞাবাক্যটির জায়গায় একটি নতুন প্ৰতিজ্ঞা বাক্য আমদানী হল-“টীকা বসন্তের প্ৰতিষেধক।” সত্যকে এভাবে একটি গতিশীল প্রক্রিয়া হিসাবে চিন্তা করলে মূল প্রতিজ্ঞাটিকেও মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে পারবেন না। কারণ শীতলা পূজার ভিতর দিয়ে যে সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তাই বর্তমানে বসন্তের টীকা পৰ্যন্ত এগিয়ে এসেছে। আরও কতদূরে এগিয়ে যাবে সে কথা এখনই বলা যায় না।


প্রতিকুল পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যবিধানের প্রচেষ্টা শুরু করার আগে মানুষকে নিশ্চয়ই প্ৰতিকুল প্ৰকৃতিত্ব কোলে জন্মগ্রহণ করতে হয়েছিল। তা হলে কোন মনুষ্য-প্ৰাণী জন্মাবার আগে যে পৃথিবীটা ছিল সে পৃথিবীটা সত্য না মিথ্যা দি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীর সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য কোন ও জীবই পৃথিবীতে ছিল না; যখন জীব এসেছে তখনও পারিপাশ্বিক সম্পর্কে বা নিজের সম্পর্কে ধারণা করার মত কোন মানুষই ছিল না। সুতরাং সামঞ্জস্য-বিধানের সমস্যাই যখন ছিল না সেই প্ৰাগজৈবিক বা প্ৰাগ মানবিক পৃথিবীটা Deweyর মতে সত্যও নয় মিথ্যাও নয়। তবে কি সে অদ্বৈত-বেদান্তের মায়া? সত্য না হলে মানুষ জন্মাল কোথায়? যদি বলা যায় প্রাগ্য জৈবিক পৃথিবীটা বর্তমানে সত্যে পরিণত হয়েছে, তা হলে বলতে হবে মানুষ যেদিন প্ৰথম পৃথিবীতে জন্মেছিল সেদিন সে সত্যই জন্মায় নি, আজই সে জন্মেছে। ব্যাপারটা। তবে খুবই অদ্ভুত দাঁড়াবে। সূর্য থেকে যে জলন্ত খাবলাটা ছিটকে গিয়ে পৃথিবীটা জন্মেছিল, সেদিনের ঘটনাটাও তা হলে আজই সত্যে পরিণত হয়েছে। তা হলে দেখা যাচ্ছে Deweyর ‘গতিশীল” সত্যের সংজ্ঞাটি অশেষ দুৰ্গতি ডেকে এনেছে। মানুষের ধারণা ও প্রচেষ্টা-নিরপেক্ষ কোন বস্তু বা ঘটনা সত্যিই আছে, এই জাতীয় একটা ধারণাকে আগে থেকেই সত্য বলে মেনে না নিলে আমাদের সকল ধারণা ও প্রচেষ্টা মহাশূন্যে প্ৰলম্বিত এক অনাদি ত্ৰিশঙ্কুর মত চিরদিন ধরে ঝুলতে থাকবে। পারিপাশ্বিক বলে একটা কিছু আছে, জীবশরীর ও তার ধারণা বলে একটা কিছু আছে এমন একটা সুনিশ্চিত নিঃসন্দিগ্ধ ধারণা আগে থেকে না থাকলে পারিপাশ্বিকের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের প্রচেষ্টা শুরু হয় কি করে? বলা যেতে পারে ঐ মূল ধারণাটা বুদ্ধিদীপ্ত নৈয়ায়িকের ধারণা নয়। ওটা জীব-সহজাত শারীরিক ধর্মেরই একটা অংশ। তা হলেও অন্ততঃ জীবশরীরের অস্তিত্বটা অনপনেয়। সত্য বলে স্বীকৃতি পাওয়া প্রয়োজন, যে স্বীকৃতি কোনও পরবর্তী প্রক্রিয়ার পরিণতি নয়, কিন্তু সকল প্রক্রিয়ার স্ব-প্রমাণ পূর্বশর্ত। এর অর্থ হল পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক ধারণা ও প্ৰচেষ্টা-নিরপেক্ষ একটা স্বাধীন বস্তুজগতের বিবর্তন প্ৰক্রিয়াও সমানে চলে এসেছে, এজাতীয় একটি প্রতিজ্ঞাকে পূর্বনির্ধারিত সত্য বলে “মেনে নিতে হবে। অথচ একথা মেনে নিলে Deweyর সত্যস্বরূপের সংজ্ঞাটিকে আমূল সংস্কার করার প্রয়োজন আনিবাৰ্য হয়ে পড়ে। গাড়ীতে চড়ে মানুষ যখন গতিশীল হয় তখন গাড়িটা চলছে বলেই মানুষ চলে। মানুষ চলছে বলে গুড়ি চলেনা। Deweyর যুক্তিতে কিন্তু ব্যাপারটা উলটাই হওয়া উচিত। মানুষের মহাকাশ যাত্রা সম্ভব হয়েছে বলেই মাধ্যাকর্ষণের সূত্রটি সত্য নয়, সূত্রটি সত্য বলেই মহাকাশযাত্রা সম্ভব হয়েছে। Deweyর সংজ্ঞানুসারে কিন্তু প্ৰথম কথাটিই ঠিক, দ্বিতীয়টি নয়। তিনি যদি একথা বলতে পারতেন যে সফল মহাকাশযাত্রায় দ্বারা মানুষের গণিত-বিজ্ঞানের প্রতিজ্ঞাগুলি সত্য (বা মিথ্যা) বলে প্ৰমাণিত হল, তা হলে কোন গোলমাল ছিল না; গোলমাল বঁধে তখনই যখন বলা হয় যে প্ৰতিজ্ঞাগুলি এখন সত্যে পরিণত হল। এমতে সত্যের অস্তিত্বটাই নির্ভর করছে সফল পরিণতিব উপর। কিন্তু বস্তুবাদী মতে সফল পরিণতি নির্ভর করছে সত্যের উপর। যখন বলা হয় বিজ্ঞানের নীতিগুলি প্ৰমাণসাপেক্ষ তখন এর অর্থ এই নয় যে, যে পৰ্যন্ত সার্থক ব্যবহারিক পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ না হল সে পর্যন্ত নীতিগুলি সত্য নয়। তাহলে তো বুঝতে হবে, নিউটনের আগে পৰ্যন্ত বিশ্বসংসার মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম মেনে চলেনি, অথবা কোপারনিক্যাসের আগে পর্যন্ত সত্যিই পৃথিবীটা সূর্যের চারদিকে ঘুরতে শুরু করেনি। “প্ৰমাণ-সাপেক্ষা” কথাটির অর্থ হল প্রমাণের দ্বারা আমরা সত্যকে জানতে পারি, নিঃসংশয় হতে পারি, কিন্তু সত্যের অস্তিত্বটা আমাদের প্রমাণ করতে পারা না পারার উপর নির্ভর করছে না। এজন্যেই আমরা বলেছিলাম, Deweyর সত্যনিরূপণের প্রচেষ্টা স্কুলের ছেলের বাড়ির দিকে মুখ ঘুরিয়ে “পিছন টানে।” স্কুলে এসে পৌছার মত। যেদিকে তিনি চলার চেষ্টা করলেন এসে পৌছালেন ঠিক তার উল্টাদিকে। কার্যের দ্বারা কারণকে জানতে গিয়ে তিনি সিদ্ধান্তে পৌছালেন যে কার্যের দ্বারাই কারণ উৎপন্ন হয়; ব্যবহারের দ্বারা সত্যকে জানতে গিয়ে সিদ্ধান্ত করে বসলেন ব্যবহারের দ্বারাই সত্য তৈরী হয়।


Pragmatism বা ব্যবহারবাদের সাথে বস্তুবাদের এই দুস্তর ব্যবধান সত্ত্বেও অনেক বিদগ্ধজন মার্কসীয় বস্তুবাদকে ব্যবহারবাদের সগোত্র বলে ঘোষণা করেছেন। অনেকে আবার Pragmatism-এর ভিতরেও প্রগতির সন্ধান পেয়েছেন। এই বিভ্ৰান্তির কারণ বোধ হয় এই যে Pragmatism ও মার্কসবাদ উভয়েই সত্যাসত্য বিচারে ব্যবহারিক পরীক্ষার ওপর অসামান্য গুরুত্ব আরোপ করেছে। সত্যের মার্কসবাদ-সম্মত সংজ্ঞা পরীক্ষা করার সময় আমরা এবিষয়ে আলোচনা করব।


।।পাঁচ।।


সত্যাসত্য নির্ধারণে পরিশ্রান্ত দার্শনিকদের কাছে সমস্যা সমাধানের দুটি চিরপরিচিত রাজপথ খোলা আছে একথা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। মানুষের অজ্ঞতার বিরাট ফাকটাকে ততোধিক বিরাট এক পরমেশ্বর দিয়ে ভতি করা যেতে পারে। সেই পরমসত্যের লীলা-ললিত প্ৰকাশভঙ্গী এই বিশ্ব, এই ভেবে সান্ত্বনা লাভ করা যেতে পারে। কিন্তু এই সান্ত্বনায় বিঘ্ন সৃষ্টি করার মত দার্শনিকের অভাব নেই। ঈশ্বরকেও যুক্তিতর্ক দিয়ে প্ৰতিষ্ঠা করতে হবে। গ্রীসের এরিস্টোটল থেকে আরম্ভ করে আমাদের দেশের সর্বশেষ নৈয়ায়িক-চূড়ামণি পৰ্যন্ত যুক্তিটা একই ধরণের। এরিস্টোটল বললেন, পালঙ্ক তৈরী করতে মিস্ত্রী চাই; নৈয়ায়িক বললেন, ঘট তৈরী করতে কুমোর চাই। কোনও বস্তু তৈরী করতে হলে তার উপযোগী উপাদানগুলিকে সাজিয়ে-গুছিয়ে কাজটা করার জন্য একজন অন্ততঃ কর্তা চাই। এমন চমৎকার বিধিনিয়মে আবদ্ধ সাজানোগুছানো এই ব্রহ্মাণ্ডটার পিছনেও একজন কর্তা থাকা প্রয়োজন। না হলে এই বিরাট ব্যাপারটা করল কে? কিন্তু তিনি তো আর কামার কুমোরের মত সীমিতশক্তি স্বল্পজ্ঞ ব্যক্তি হতে পারেন না। তাঁকে অমিতশক্তি সর্বজ্ঞ হতে হবে। এই সর্বজ্ঞপুরুষের নাম দেওয়া হল ঈশ্বর। কিন্তু এতেও ঈশ্বরের প্রতিষ্ঠা নিরঙ্কুশ হল না। গোলমাল বেঁধেছে। অনুমানের মূলনীতি নিয়ে। ঘট তৈরী করেন। কুম্ভকার, সুতরাং জগত তৈরী করেন ঈশ্বর, একথা বললেই চলবে না। এ যুক্তির পিছনে একটা সাধারণ নিয়ম আছে, যাকে একটা ব্যাপক মূলসূত্র হিসাবে দাঁড় করানো প্রয়োজন, যেমন, “যা কিছু কাৰ্য বলে প্ৰতিভাত হয় তার পিছনে একজন কর্তা আছেন।” এই মূল সূত্রটিকে দাঁড় করাতে না পারলে ঈশ্বরকেও দাঁড় করানো অসম্ভব। প্রশ্ন হল, ঘট-পটের কর্তা কুম্ভকার-তত্ত্ববায়কে দেখেই সকল কার্যেরই একজন কর্তা আছে এতখানি কল্পনা করার মত এতবড় একটা উল্লস্ফন দেওয়া কি যুক্তিযুক্ত? তাহলে সব জায়গাতেই লাফটা দিয়ে দেখুন না? মনে করুন। আপনি এক লম্ফৰীরের সঙ্গে চলেছেন। পথে একটা খাল পড়েছে, বীরবির একলাফে পgর হয়ে গেল, আপনার দেহটি দুর্বল, কিন্তু অনুমানী শক্তিটি প্ৰবল; আপনি লম্ফৰীরের উদাহরণ থেকে একটা নৈয়ায়িকসুলভ মানসিক লাফ দিয়ে একটা সাধারণ সূত্র আবিষ্কার করে ফেললেন,–এইমাত্র যে খাল পার হল সে মানুষ, তা হলে “মানুষে এই খাল পার হতে পারে।” এই সূত্রটি পাবার পরই—“আমিও মানুষ, সুতরাং আমিও পার হতে পারি,” এই আপনার সিদ্ধান্ত। এখন তা হলে লাফটা দিয়ে দেখুন, মজাটা কি হয়। তখন আপনাকে বলতে হবে,–ঐ রকমের বিশেষ-শক্তিসম্পন্ন মানুষই খালটা পার হতে পারে,–আপনার সাধারণ নীতিসূত্রে মানুষের ঐ উপাধিটা বাদ দিয়েছিলেন বলেই আপনি এখন জলে পড়েছেন।


এখন তাহলে “কাৰ্যমাত্রেরই কর্তা আছে।” এই সাধারণ সূত্রটিরও একটু সংকোচ সাধন করা প্রয়োজন হতে পারে। মানুষের বহুযুগব্যাপী অভিজ্ঞতার ফলে কোনটা প্ৰাকৃতিক জিনিস আর কোনটা কৃত্রিম অর্থাৎ কোনও প্ৰাণী বা মানুষের তৈরী, এবিষয়ে একটা ধারণা হয়েছে, যার ফলে চেয়ার টেবিল দেখামাত্র বলতে পারা যায় যে কোনও মিস্ত্রী এগুলি তৈরী করেছে। তাই চোয়ারটা ভেঙ্গে গেলে আমরা মিস্ত্রী ডেকে মেরামত করাই, পরমেশ্বরকে ডাকি না। সুতরাং কাৰ্যমাত্রেরই কর্তা আছে এই সাধারণ সূত্রটির সংস্কার সাধন করে এ রকমভাবে দাঁড় করানো যেতে পারে—“যেসব জিনিসের ভিতরে প্রাকৃতিক বিধিবিধানের অতিরিক্ত বুদ্ধি-কৌশল প্রয়োগ করার ছাপ আছে তার কোন না কোন কর্তা আছে।” তাই বনের গাছটা। যখন তক্তা ও টেবিল হয়ে গেল তখন আমরা সূত্রধরের কৃতিত্ব অনুমান করি। এর দ্বারা প্ৰাকৃতিক গাছপালা পাহাড়-পর্বত গ্ৰহ-নক্ষত্রেরও এক অতিমানব কর্তা আছে-এ জাতীয় অনুমান অযৌক্তিক। এই অতি প্ৰলম্বিত অনুমানটি শক্তিহীন অবিবেকী বামন ব্যক্তিটির অমূলক লম্ফ প্রদানেরই সামিল। সুতরাং ন্যায়শাস্ত্রীয় পরিভাষা অনুসারে “কার্যমাত্রেরই কর্তা আছে।” এই ‘ব্যাপ্তি” বা সাধারণ সূত্রটি “ব্যভিচারী।” কুম্ভকার, সূত্রধর বা তন্তুবায়ের মত সুৰ্য চন্দ্ৰ তারা ও সসাগর। পৃথিবীর কোনও কর্তা কখনও পরিদৃষ্ট হয় না। কাজেই কাপড়খানা দেখে বর্তমানে সামনে অনুপস্থিত কোন কারিগর বা তাতীর কৃতিত্ব অনুমান করা সম্ভব। কিন্তু তাই বলে, এই কাপড়ের দৃষ্টান্ত টেনে পৃথিবীর পিছনে ঈশ্বরের কৃতিত্ব অনুমান করা যায় না।


S 8V • সমাজ সাহিত্য ও দর্শন


ঈশ্বর বিশ্বাসী তাকিক তুমুল আপত্তি তুলবেন । বলবেন-এ কেমন কথা! অনুমান মানেই হল যা দেখা যায় তার ভিত্তিতে যা দেখছি তার অনুসন্ধান করা। জগৎ সংসারের কোন কর্তায় অস্তিত্বই তো অনুসন্ধান করছি। আর তুমি বলছি—তাঁকে দেখা যাচ্ছে না। তাই আমার মূলসূত্রটিই ভুল। এখন যদি তাকে দেখাই যেত তা হলে আর অনুমানের দরকারটা কি ? প্ৰত্যক্ষ পাচ্ছিন বলেই তো অনুমান করছি। তোমার কাপড় কেনার সময় তঁাতীকেও সঙ্গে কিনে নিয়ে আসছ না তো ? তুমি যেমন বর্তমানে অপ্রত্যক্ষ তঁাতীর অনুমান করছি আমি তেমনি বর্তমানে অপ্ৰত্যক্ষ ঈশ্বরের অনুমান করছি। যে বিষয়ে আমি অপ্ৰত্যক্ষ কর্তার অনুমান করছি সেই বিষয়টি দেখিয়েই বলা চলে না৷-“কাৰ্যমাত্রেরই কর্তা আছে’ এই সূত্রটি ভুল। তা হলে “কাপড় মাত্রেই ভঁাতীর তৈরী” এই সূত্রটিও ভুল বলতে পারি। তোমার কাপড়খানু দেখিয়ে বলব। এ কাপড়ের তো তাতী দেখছি না। তখন নিশ্চয়ই প্ৰত্যুত্তরে বলা হবে, এই কাপড়ের বেলাই তো আমি তত্ত্ববায়ের কৃতিত্ব অনুমান করছি। কাজেই এরই নজির দেখিয়ে “কাপড় মাত্রেই তাতীর তৈরী” এই সূত্রটি ভুল বলা যাবে কি করে ? তা হলে আমার ঈশ্বরের বেলাও ঐ একই কথা খাটবে।


ঈশ্বর-বিশ্বাসী তাকিকের এ যুক্তি মেনে নিলে কিন্তু অনেক বিপদের সম্ভাবনা আছে। তা হলে কোনও অনুমানকেই আর ব্যভিচারী বলা চলবে না। জগৎটা ঈশ্বর আর শয়তান দুয়ে মিলে তৈরী করেছে এরকম অনুমানও করা যেতে পারে। জগতে মঙ্গল অমঙ্গল দুই-ই যখন আছে তখন স্রষ্টার ভিতরে সুবুদ্ধি আর কুবুদ্ধি দুই-ই থাকতে হবে। ঈশ্বর যদি শুধু মঙ্গলময়ই হন, তবে অমঙ্গলকারী এক শয়তানও থাকতে হবে। এই দুয়ে মিলে অনেকক্ষণ পাঞ্জা লড়ার পর বোধহয় একটা আপোস্য-রফা হল ; কিছু মঙ্গল আর কিছু অমঙ্গল মিশিয়ে জগৎ সৃষ্টি করা হল। এখন আরও কল্পনা করা যাক ঈশ্বর ও শয়তান পালা করে রাজত্ব চালাচ্ছেন। যখন ঈশ্বর রাজা তখন মঙ্গলের দিকটাই ভার হয়। যখন শয়তান রাজা তখন অমঙ্গলের দিকটাই প্রবল হয়। ঈশ্বর-বিশ্বাসী তাকিক যে যুক্তি দিলেন তাকে ন্যায়ের পারিভাষিক সূত্রে রূপান্তরিত করলে দাঁড়ায়-“পক্ষে সাধ্যের আদর্শন দেখিয়ে কেউ অনুমানকে ব্যভিচারী বলতে পারে না।” “ঘট মাত্রেই কুম্ভকারের সৃষ্টি” এই সাধারণ সূত্র গ্রহণ করার পর, যখন একটা ঘটা দেখছি, কিন্তু কুম্ভকারকে দেখছি না, তখন এ ঘটটিও কোন কুম্ভকার কর্তৃক সৃষ্ট হয়েছে বলে অনুমান করছি। এ অনুমান নির্ভুল। এখানে ন্যারের পরিভাষায় এই বিশেষ ঘটটিকে বলা হয় “পক্ষ”, এবং ‘কুম্ভকার কর্তৃক সৃষ্ট” এই অনুমেয় বিষয়কে বলা হয় “সাধ্য”। এখন একথা বলা চলবে না,– এই ঘটটির বেলা কুম্ভকারকে দেখছি না, সুতরাং “ঘট মাত্রেই কুম্ভকারের সৃষ্টি” এই সাধারণ সূত্রটি ভুল।


কথাটা ঠিকই। কিন্তু প্রশ্ন হল কি জাতীয় দৃষ্টান্ত থেকে কত বড় সাধারণ সূত্রে আপনি যেতে পারেন, তার একটা সীমা থাকা দরকার। আপনার খুশিমত কোন একটা পক্ষ স্থির করে একটা অতি ব্যাপক সাধারণ সূত্রে যাবার অধিকার আপনার আছে কিনা? ঘটের কর্তা কুম্ভকারকে দেখে জগতেরও একজন কর্তা সাব্যস্ত করা আপনার প্রয়োজন পড়েছে; তাই ঘটের দৃষ্টান্ত থেকে কাৰ্যমাত্রেরই কর্তা আছে এরকম একটা সৰ্বব্যাপক সাধারণ সূত্রে যাওয়ার আপনার অধিকার আছে কিনা? সর্বশ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ দার্শনিক আচাৰ্য ধৰ্মকীর্তি ঠিক এই মৌলিক প্রশ্নটিই তুলে ধরেছেন। তিনি বললেন এ জাতীয় কোন সীমা না মানলে অনেক অদ্ভুত সিদ্ধান্তে যেতেও আমাদের বাধা থাকবে না। ধৰ্মকীতি একটি উদাহরণ দিলেন যার ব্যঙ্গরাসটুকুই শুধু উপভোগ্য নয়, মৌলিক প্রশ্নের দিক থেকে যার তাৎপর্যটিও খুবই গভীর। ধরুন, মাটি দিয়ে তৈরী ঘটটার সৃষ্টিকর্তা কুম্ভকার-এই দৃষ্টান্ত থেকে কেউ একটা সাধারণ সূত্র বা ব্যাপ্তি ঠিক করে ফেলল। “যা মাটি দিয়ে তৈরী তাই কুমোরের কাজ” তারপরে একটা উইয়ের ঢিবি দেখেই,–“এই ঢিবিটাও মাটির তৈয়ী, সুতরাং এটিও কুমোরের কাজ” এই বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল। এখন এই অনুমানকে আপনি ঠেকাবেন কি করে? যদি বলা হয় উই-চিবির পিছনে কুমোরের কর্তৃত্ব দেখা যায় না বলে “যা মাটি দিয়ে তৈরী তাই কুমোরের কাজ” এই সাধারণ সূত্রটি ভুল; তবে জগৎসংসারের পিছনে ঈশ্বরের কর্তৃত্ব দেখা যায় না বলেই “কাৰ্য মাত্রেরই কর্তা আছে।” এই সাধারণ সূত্রটিও ভুল। এরকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যার ফলে গৃহিণীর নিত্য নূতন গঞ্জনা থেকে আপনি রেহাই পাবেন না। মনে করুন দশদিন, দশটা পকেট মেরে কোন পকেটমার একটা সাধারণ সূত্র আবিষ্কার করে ফেলল“পকেট কাটলেই টাকা পাওয়া যায়”, আর আপনার গৃহিণীও জানেনপকেটমার পকেট কাটে টাকা পায় বলেই। একদিন আপনি কাটা পকেট নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। আপনি জানেন বেচারা পকেটমার বেয়াকুব হয়ে সেদিন আপনার চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করেছে। কিন্তু আপনার গৃহিণী ও পকেটমার একই সাধারণ সূত্রে বিশ্বাসী। আপনি পকেটমারের দুৰ্গতি ভেবে আনন্দে ঘরে ফিরছেন-জানেন না। আপনার কপালে কি দুৰ্গতি আছে। কাটা পকেট দেখে ভীতিকাতরা গৃহিণীকে আপনি বুঝবেন কি করে যে আপনার টাকা মারা যায়নি। নিশ্চয় মারা গেছে, না হলে পকেটমার পকেট কেটেছে কেন? পরদিন আপনার অফিসের পথখরচ ও টিফিন বাবদ পকেটের বরাদ চার আনায় নেমে দাঁড়াল। গৃহিণী আপনার বুদ্ধিমতী, যদিও তার সেদিনের অনুমানটি আপনার মতে মিথ্যা। কিন্তু কেন মিথ্যা হবে? পকেটে টাকা দেখা না গেলেও কোন অদৃশ্য টাকা নিশ্চয়ই ছিল। “পক্ষা’রূপী পকেটে ‘সাধ্যা’রূপী টাকার দেখা পাওয়া না গেলেই কি অনুমান ভুল হবে? যার পকেট কাটা গেছে তিনি ঈশ্বর-বিশ্বাসী তার্কিক হলে গৃহিনীর এই তর্কের জবাব দিতে হিমসিম খাবেন।


আবার দেখুন-কেউ যদি এ জাতীয় অনুমান করেন— বড় বড় কাজ করতে অনেক কারিগর দরকার হয়, যেমন দালান বাড়ি নগরী তৈরী করতে অনেক মিস্ত্রী প্রয়োজন। সুতরাং বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের মত একটা বিরাট ব্যাপার ঘটাতে অন্তত কয়েক কোটি ক্ষুদে ঈশ্বরের দরকার হয়েছে। এক ঈশ্বর কল্পনা করলে আপনার কল্পনার লাঘব হলেও ব্ৰহ্মাণ্ড সৃষ্টির গৌরবটা তার প্রাপ্য নয়।


আবার ধরুন, কেউ বললেন—বিচিত্র রচনাময় দালাল কোঠা ঘর বাড়ি আমাদের মত মানুষের তৈরী, সুতরাং বিচিত্র জগৎটাও আমাদের মত আরো। অনেক মানুষ মিলে তৈরী করেছে।


যদি বলা হয় বিপুল বিশ্ব মানুষের পক্ষে তৈরী করা সম্ভব নয়, তা হলে উন্ট অনুমান করাটা আরও সহজ-বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ড কোন সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেনি, কারণ মানুষের পক্ষে এ সৃষ্টি সম্ভব নয়, এবং আমাদের সামগ্রিক অভিজ্ঞতায় মানুষ ছাড়া কোনও স্রষ্টাও আর চোখে পড়েনি (অবশ্য মৌমাছি বোলতা ইত্যাদি কিছু কীট পতঙ্গ ছাড়া)।


এভাবে পরমসত্যের চরম বিভ্রান্তি হিসাবে পরমেশ্বরকে মেনে নিয়ে সত্যানুসন্ধ্যানী নিষ্কণ্টক হতে পারেন না। পদে পদে তিনি তর্কের জালে জড়িয়ে পড়বেন। আমাদের দেশের বৈষ্ণব দার্শনিকদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ তার্কিক মাধ্ববৈদান্তিকরাও শেষ পর্যন্ত নৈয়ায়িকদের ঈশ্বরানুমানে ঘোরতর আপত্তি তুলেছেন। নব্যন্যায়ের জনক গঙ্গেশোপাধ্যায়ের ঈশ্বরবাদ খণ্ডন করে ব্যাসতীর্থ সিদ্ধান্ত করলেন-আনুমানিক যুক্তিতর্কের দ্বারা ঈশ্বরের প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। শাস্ত্রবাক্যে বিশ্বাসের উপরেই ঈশ্বর প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ—বিশ্বাসে মিলায় কৃষ্ণ, তর্কে বহুদূর।


কিন্তু অবিশ্বাসীর গতি নরক হলেও ইহালোকে ঈশ্বরের গতি খুব নিষ্কণ্টক হল না। তাই একদল দার্শনিক সত্যাসত্যনির্ণয়ের দ্বিতীয় রাজপথটি বেছে নিলেন—এটিকে এক জাতীয় শূন্যমাৰ্গ বলা যেতে পারে। তারা বললেন-শেষ পর্যন্ত আমরা এই নির্ণয় করলাম,–কিছুই নির্ণয় করার উপায় নেই। কিছুই জানা যায় না-এই হল সার সত্য। আমাদের ইন্দ্ৰিয়লব্ধ অভিজ্ঞতার চপলমুহুর্তগুলি মিছিল করে চলেছে, ঐ চপল মুহুর্তগুলি সম্পর্কেই একমাত্র আমরা নিঃসংশয় হতে পারি। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরে কোন বস্তুসত্তা আছে কি নেই, বস্তুজগতের কোনও ঘটনা আমাদের অভিজ্ঞতাগুলিকে উদ্বোধিত করছে কিনা, সে কথা কেউ হলফ করে বলতে পারে না। একথাগুলি যিনি বলছেন তিনি নেই, কথাগুলোও নেই, কোন শ্রোতা নেই, পাঠক নেই, কথায় ঠাসা বইগুলোও নেই, অন্তত এসব আছে বলে কোন নিশ্চিত প্ৰমাণ নেই। তাহলে আর এ অমূল্য কথাগুলো বলার জন্য, লেখার জন্য এত পরিশ্রমেরই বা কি দরকার ছিল?


।।ছয়।।


যে বাট্ৰাণ্ড রাসেল “মানবকেন্দ্ৰিক” মার্ক্সীয় দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গীতে আপত্তি জানিয়েছেন তার নিজের নিরালম্ব দর্শন একসময় কতদূর পর্যন্ত এগিয়েছিলেন তাও একটু ভেবে দেখা দরকার। একসময় “মনোবিকলনের” ( ‘Analysis of Mind’ ) ভিত্তিতে তিনি এতদূর পর্যন্ত এগিয়েছিলেন যে মানুষের মগজ বলে কিছু আছে কিনা সে সম্পর্কেই সন্দেহ জাগে। আমি আমার মগজটা দেখতে পাই না । কোনও শরীরতত্ত্ববিদ বা Physiologist আমার মাথার খুলিটা ভেঙে আমার মগজ দেখার চেষ্টা করতে পারেন । কিন্তু তখনও তিনি আমার মগজ দেখতে পাবেন না। তার চক্ষুরিভিদ্ৰয়ের ভিতর দিয়ে আমার মগজের ছবি তার মগজে যে কম্পন জাগাবে তিনি তাই শুধু অনুভব করতে পারবেন। এর বেশী তার কিছু জানিবার কথা নয়। অথচ তিনিও তো তঁর নিজের মগজটা দেখতে পারেন না । মগজের এই মজা দেখে ওটাও যে আছে সেকথা নিশ্চয় করে বলার জো নেই। কিন্তু তার চেয়েও মজার কথা আজ নব্বই বছরের বৃদ্ধ এই প্ৰতিভাশালী দার্শনিক পরমাণু বোমার আঘাতে ব্ৰহ্মাণ্ডের মানুষের জীবন যাতে লণ্ডভণ্ড না হয়। সেজন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও কুষ্ঠিত নন। প্রথম মহাযুদ্ধের সময়েও যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তিবাদী আন্দোলন পরিচালনা করার জন্য বিনা দ্বিধায় তিনি বিলাতের জেল খেটেছিলেন । “বিশুদ্ধ দর্শনের’ পক্ষ থেকে “মানব-কেন্দ্ৰিক” দর্শনের বিরুদ্ধে যিনি মৌলিক আপত্তি জানিয়েছেন জীবনের প্রান্তিক সন্ধ্যায় উত্তীর্ণ সেই দার্শনিকের সুনিবিড় মানবপ্ৰেম আজ মানুষের অকৃপণ শ্রদ্ধা ও সন্ত্ৰম আকর্ষণ করেছে।


তথাপি তার মূল দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গীর শেষ পরিণতি হিসাবে ১৯৫৯ সালেও যে ঘোষণা তিনি করেছেন তার ভিতরেও একথা স্পষ্ট যে বার্কলি ও হিউমের ভুত তার ঘাড় থেকে এখনো নামেনি। এখন তিনি অবশ্য আপন অভিজ্ঞতা-নিরপেক্ষ একটা বহির্বিশ্বের অস্তিত্বের উপর নিঃসংশয় বিশ্বাসের কথা ঘোষণা করেছেন । তাহলেও শেষরক্ষা যে করতে পারেন নি তার প্রমাণটাও স্পষ্টভাবে তাঁর কথার মধ্যে ধরা পড়েছে। “জগত সম্পর্কে আমার বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গী” বলতে গিয়ে তিনি একটি মূল্যবান নীতিসূত্রের অবতারণা করেছেন যা বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর সগোত্র। “দার্শনিকরা সাধারণতঃ, কি করে আমরা জানি,-জ্ঞানলাভের এই পদ্ধতি থেকে শুরু করে, মুমরা কি জানি, সে সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার চেষ্টা করছেন। আমি মনে করি এ দৃষ্টিভঙ্গীটা ভুল। কারণ কি করে আমরা জানি তা আমরা যা জানি তারই একটা ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র।” এ কথাটি এইজন্য মূল্যবান যে আমাদের জ্ঞান-নিরপেক্ষ স্বতন্ত্র বস্তুজগতের অস্তিত্ব মেনে না নিলে আমরা কি করে জানি তাও জানতে পারি না। কিন্তু মানুষের মগজের উদাহরণ থেকে তিনি আগে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে চেয়েছিলেন তার ছাপ এখনও তাঁর মগজে আঁকা আছে -“আপনি যে মগজটার দিকে তাকিয়ে আছেন সেটা নিঃসংশয়ে বস্তুজগতেই অংশ, কিন্তু এই বাস্তব মগজটা আপনার জ্ঞানের বিষয় নয়। … আমি একথাই বলতে চাই, আমরা কেবল আমাদের নিজেদের মাথার ভিতরে যা ঘটছে। তাই দেখতে পারি, অনুভব করতে পারি। তার বাইরে আর কোন কিছুই দেখতে বা অনুধাবন করতে পারিনা … গাণিতিক পদার্থবিদ্যার পদার্থগুলি কোন বাস্তব পদার্থ নয়, ওগুলি গণিতবিদের সুবিধার জন্য কতগুলি ঘটনাকে মিলিয়ে নিয়ে তৈরী করা বুদ্ধিগত কল্পনামাত্র। দ্বিতীয়তঃ, অনুমানের মাধ্যম ছাড়া আমরা যা কিছু জানি তা সবই আমাদের ব্যক্তিজগতের ব্যাপারমাত্র। এবিষয়ে আমি বার্কলির সঙ্গে একমত। চাক্ষুষ অভিজ্ঞতায় যে তারাভরা আকাশটাকে আমরা জানি সে আকাশ আমাদের অন্তরে। বাহিরের আকাশটা আমরা অনুমান করি। তৃতীয়তঃ যে কাৰ্যকারণ-ধারার মারফত আমরা বিচিত্র ও বিভিন্ন ধরনের বস্তুকে জানতে পারি, সেই ধারাগুলিও মরুভূমিতে নদীর মত মিলিয়ে যায়।” (My Philosophical Development-My Present View of the World)


এখানে কিন্তু যে বস্তুবাদী জ্ঞানসূত্র থেকে রাসেল তার সর্বাধুনিক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গীটি আমাদের কাছে খুলে ধরবেন বলে আশা সৃষ্টি করেছিলেন সেই সূত্র থেকে তিনি বিচ্যুত হয়েছেন। কি করে জানি এটাই তাঁর কাছে শেষ সিদ্ধান্তে বড় হয়ে উঠেছে। জগৎটা প্ৰত্যক্ষ সত্য নয়, কিন্তু অনুমেয় সত্য—এটা নুনাধিক দুই হাজার বছর আগেকার সৌত্ৰিাস্তিক বৌদ্ধদের মত। কিন্তু যে যুক্তিতে প্ৰত্যক্ষ সত্যকে নিরসন করা হয়েছে সেই একই যুক্তিতে অনুমেয় সত্যকেও নিরাশ হতে হবে। মস্তিষ্কের স্নায়ুকেন্দ্রের কম্পনগুলির বাইরে আর কোনও কিছুই প্রত্যক্ষ নয় একথা মেনে নিলে অনুমানেরও নিস্তার নেই; কারণ অনুমানটাও তো মস্তিষ্কেরই একপ্রকার প্রক্রিয়া। সুতরাং এই প্রক্রিয়ার বাইরে অনুমেয় বহিঃসত্য বলে কিছু যে আছে তা জানার কোনও উপায় নেই। মস্তিষ্কের প্রক্রিয়া দিয়েই যদি জগতের সকল সত্যাসত্য ব্যাখ্যা করতে হয় তবে অনুমান ও বলে কিছু যে আছে তা জানার কোনও উপায় নেই। মন্তিকের প্রক্রিয়া দিয়েই যদি জগতের সকল সত্যাসত্য ব্যাখ্যা করতে হয় তবে অনুমান ও প্ৰত্যক্ষের ভিতরে কোনও তফাত করা দুঃসাধ্য। এ হিসাবে অনুমানটাও এক রকমের প্রত্যক্ষ । প্ৰত্যক্ষের বেলাও যেমন স্নায়বিক উত্তেজনার বাইরে কোনও স্বতন্ত্র উত্তেজক বহিঃপদার্থ আমাদের গোচরীভূত নয় ; অনুমানের বেলাতেও মস্তিষ্কাস্থিত আনুমানিক কাৰ্যকলাপের বাইরে আর কিছু অনুভব করছি এমন কথা বলা চলে না । যদি বলা যায়, কোনও উদ্দীপক বহিঃপদার্থ না থাকলে উদ্দীপনা সৃষ্টি করিল কে, তাই বহির্বিশ্ব কিছু আছে ; এর উত্তরও পরিষ্কার,- এই যুক্তিটা যে দেয়া হল এত মাথারই একটা কাজ। কাজেই মাথার বাইরের ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানো অসম্ভব। সৌত্ৰিান্তিক দর্শনের বিরুদ্ধে এই দুর্লঙ্ঘ্য যুক্তি উপস্থিত করলেন প্রজ্ঞাকর গুপ্ত। ধর্মকীতির শ্রেষ্ঠ কীতি। “প্ৰমাণবাতিকে”র অপ্ৰতিদ্বন্দ্বী ভাষ্যকার প্রজ্ঞাকর গুপ্ত এইযুক্তি উপস্থিত করলেন বিজ্ঞানবাদীর তরফ থেকে। তথাপি এর ভিতর দিয়ে সৌত্ৰিান্তিক মতের গুরুতর দুর্বলতা ধরা পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে বাট্ৰাণ্ড রাসেলের সর্বাধুনিক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গীর দুর্বল স্থানটিও বারোশিত বছর আগেকার প্রজ্ঞাকির দেখিয়ে দিলেন ।


এর সঙ্গে রাসেল বাণিত মগজ পরীক্ষার বিশ্লেষণ পদ্ধতিটিও মিলিয়ে দেখুন। আখেরে গিয়ে কি অবস্থা দাঁড়ায়। আমার ইন্দ্ৰিয়সমূহ, আমার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, আমার দেহের রক্তের জোয়ার, আমার স্নায়ুজাল ও মস্তিষ্ক কোনও কিছুই আমার প্রত্যক্ষ নয় ; একমাত্ৰ প্ৰত্যক্ষকতগুলি শূন্যে ভাসমান অনুভূতি। রাসেলের যুক্তিতে মস্তিষ্ক ও স্নায়ু কেন্দ্রের কম্পনগুলিও অনুমান মাত্র। সুতরাং রাসেল যখন বললেন আমরা যা কিছু দেখি শুনি সবই আমাদের মাথার ভিতরে তখনও তিনি ঠিক কথা বলেন নি। কারণ ঐ কথার কয়েক পংক্তি আগেই তিনি বলেছেন, আমার মাথাটা আমিও দেখি না অন্যেও দেখে না। তার উপরে “আমি তুমি” এগুলোও কথার কথা। দেকার্তে অন্ততঃ একটা ব্যাপারে নিঃসন্দেহ ছিলেন—“আমি যে আছি এ বিষয়ে আমার সংশয় নেই।” এখন কিন্তু ব্যকরণের প্রথম মধ্যম উত্তর এই তিন পুরুষই ভিটেছাড়া হ’ল। বস্তুহীন মহাশূন্যে পরস্পর বিসংলগ্ন কতকগুলি অনুভূতির কণিকা ভেসে বেড়াচ্ছে, সেগুলির কোন মালিকানা নেই, কারণ তারা কারুর নয়। কারণ আর কেউ বলে কিছু নেই। দর্শনের এই “অ-পৌরুষেয়তা” আধুনিক পাশ্চাত্ত্য দর্শনে পুরুষত্বহীনতায় পৰ্যবসিত হয়েছে।।


রাসেল এতটা চরম সিদ্ধান্ত করেন নি, কিন্তু তার যুক্তি অনুসরণ করলে এ পর্যন্ত যেতে হয়। বস্তুজগতের উপর রাসেল যে নিঃসন্দিগ্ধ বিশ্বাস পোষণ করেন বলে ঘোষণা করেছেন, সে বিশ্বাসটা ঠিক তার দার্শনিক বিশ্বাস নয়, ওটা একটা সহজাত মানবিক বিশ্বাস যার সঙ্গে তার দার্শনিক যুক্তির সামঞ্জস্য নেই। মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও তিনি অনপনেয়। আশা (incurable optimism) পোষণ করেন। যদিও তার বিশুদ্ধ দর্শনের যুক্তি অনুসারে তুচ্ছ মানুষ থাকল বা গেল তাতে বিশ্বের কিছু আসে যায় না।


রাসেল “মানবকেন্দ্ৰিক” মার্কসীয় দর্শনের দুর্বলতা দেখতে পেয়েছেন, কিন্তু তাঁর নিজস্ব ‘বিশ্ব গ্রাসী।” দর্শন বিশ্ব-পরিক্রম শেষ করে অবশেষে অনুভূতি-সর্বস্বতায় বিশ্রান্তি লাভ করেছে। বহি:সত্য অনুমেয় মাত্ৰ— এই “সৌত্ৰিান্তিক” সত্যের সূত্র ধারণ করে তিনি “যোগাচারী বিজ্ঞানবাদে।” এসে পৌঁছেছেন। যোগাচার-বৌদ্ধমতে একমাত্র স্বানুভূতি বা স্ব-সংবেদনই প্ৰত্যক্ষ সত্য; অনুমিতি ও স্ব-সংবেদনেরই প্ৰকারভেদ মাত্র। বহির্বিশ্বের অস্তিত্বের প্ৰতি পরিনিষ্ঠিত বিশ্বাসটাও এক ধরনের অনুভূতি। এই বিশ্বাস-বিধৃত বিপুল ব্ৰহ্মাণ্ডটা আমার জ্ঞান-কাণ্ডেরই একটা অংশমাত্র। একদিন তিনি একথাই বলতেন। আজ তিনি বলুন আর নাই বলুন তার সকল যুক্তি ও দৃষ্টান্তের গতি ও প্রকৃতি আজও এই একই সিদ্ধান্তে আমাদের টেনে নিয়ে যায়।


।।সাত।।


যে ‘মানবকেন্দ্ৰিক” মার্কসীয় দর্শন রাসেলের দার্শনিক প্ৰজ্ঞাকে পীড়িত করেছেন তার “মানকেন্দ্রিকতা” কি ধরনের সে বিষয়ে আমাদের বিচার করা প্রয়োজন। একদিন মার্কসীয় দর্শনের বিরুদ্ধে ধাৰ্মিক মহলের প্রধান আপত্তি ছিল যে এ দর্শন ন্যাক্কারজনীক জড়বাদের নির্লজ চারণকাব্য। বিশ্ববিদ্যার আড়তগুলিতে যে আড়তদাররা সারস্বত শয্যা পেতে রেখেছিলেন তাঁরা এ দর্শনের কলুষিত স্পর্শ থেকে দেবী সরস্বতীকে শত হস্ত দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু সে যুগ আজ পাল্টে গেছে। এই “জড়বাদী” দর্শন যে দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রতিফলিত হয়ে বিশ্ববাসীর বিমুগ্ধ বিস্ময় ও বিপুল বিশ্বাস উৎপাদন করেছে সে দেশ আজ পৃথিবীর সারস্বত তীর্থ। মস্কো এখন আর কেবল কমিউনিস্টদের “মক্কা’’ নয়। বরঞ্চ এই মক্কায় এখন অকমিউনিস্টদের আনাগোনাটাই বেশী করে চোখে পডে। এমনকি পৃথিবীর অনেক কমিউনিস্ট-বিরোধীও এই “জডবাদের” তীর্থভূমির অকৃপণ প্ৰসাদ পেয়ে পরিপুষ্ট লাভ করছে। এ কথাও আজ অনেকেরই জানা হয়ে গেছে যে এই “জড়-দর্শনের” উপাসকবৃন্দ যখন সকল পার্থিব ভোগবিলাস উপেক্ষা করে মানুষকে মানুষের মত বাঁচাবার জন্য কৃচ্ছ্র-কঠোর জীবন বরণ করে নিয়েছিলেন তখন ধৰ্মরাজের বরপুত্ৰগণ বিত্তবানদের কাঞ্চন-প্ৰসাদের প্ৰত্যাশায় জড়বাদের মুণ্ডপাত করার ব্ৰত ধারণ করেছিলেন।


কলেজ জীবনে দর্শনের অধ্যাপক যখন নিঃসঙ্কোচে শিখিয়ে চলতেন,- গ্ৰীসদেশে এপিকিউরাস নামে এক জডবাদী দার্শনিক ছিলেন যাঁর সার নীতি ছিল—খাও দাও স্ফূর্তি কর, Eat, drink, and be merry, তখন মুগ্ধ চিত্তে অধ্যাপকের পাণ্ডিত্য ও নীতিনিষ্ঠার তারিফ করেছি। আজ বড় হয়ে অনেকদিন পরে জানতে পেরেছি। এপিকিউরাস এমন কথা কোন দিন বলেন নি। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অপরিসীম কৃচ্ছসাধক, বাল্য আর যৌবন কেটেছে তার অন্তহীন দারিদ্র্যে। শুধু রুটি আর জল ছিল তার দৈনিক খাদ্য। তার উপরে একটু চীজ মিললে তিনি সেদিন ভোজের আনন্দ অনুভব করতেন। যে যুগে ঈশ্বর বিশ্বাসী জাদরেল দার্শনিক প্লেটো বা এরিস্টেটলের ঘরে শ” পাচেক ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসী না থাকলে দার্শনিক চিন্তায় অঙ্গসেবার আমেজ জমত না, সেইযুগে পরমাণুবাদী নিরীশ্বর এপিকিউরাস ক্রীতদাস প্রথাকে নৈতিক অপরাধ বলে ঘোষণা করেছিলেন। এই মিতাহারী মিতাচারী জড়বাদীর গৃহে ক্রীতদাসীরা ঠাই পেয়েছিল সাম্য স্নেহ ও সম্মানের ভূমিতে। এমনকি সমাজের অবজ্ঞাত উৎপীড়িত বারাঙ্গনদের পর্যন্ত বিত্তবানদের লালসা থেকে রক্ষা করার জন্য নিজের স্নেহস্নিগ্ধ গৃহে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এজন্য তার বিরুদ্ধে লালসাসিক্ত ধাৰ্মিকদের কুৎসার অন্ত ছিল না । ছাত্র ও শিষ্যদের অতি সামান্ত দানে কায়ক্লোশৈ তার দিন চলে যেতে। বিত্তশালী ক্ষমতাবান প্ৰভুদের অনুগ্রহের পরোয়া না করে মানুষের প্রতি সুস্নিগ্ধ ভালোবাসায় সমুজ্জল এই দরিদ্র দার্শনিক অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার ভিতর দিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে গেলেন। জুলিয়াস সিজারের সমকালীন বিখ্যাত লাতিন কবি লুক্রেসিয়াস এপিকিউরাসকে মানুষের রক্ষাকর্তা বলে স্মরণ করেছিলেন। এপিকিউরাসের দর্শনের কাব্যময় রূপ তিনি যে কবিতায় নিবদ্ধ করেছিলেন সেই বিখ্যাত কবিতা বহুযুগ ধরে ধাৰ্মিকশাসিত সমাজে অপাংক্তেয় ছিল। মধ্যযুগের পাদ্রীদের রোষবহ্নি থেকে একখানা মাত্ৰ পাণ্ডুলিপি কোনক্রমে রক্ষা পেয়েছিল। তাই লুক্রোসিয়াস বরাতের জোরে অমরত্ব লাভ করেছেন। লুক্রোসিয়াস যে শেলীর প্রিয় কবি হয়েছিলেন তাতে আর আশ্চর্যের কি আছে? আমাদের দেশের ‘ধাৰ্মিক’ দার্শনিকরাও জড়বাদী চাৰ্বাকের যে কুৎসিত চিত্ৰ একেছেন তাতে এপিকিউরাসের নামে আরোপিত “eat, drink and be merry”-র নীতিকথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এপিকিউরাসের প্রায় তিনশত গ্ৰন্থই চিরকালের মত নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে। সামান্য দু-এক টুকরো লেখা মাত্র রক্ষা পেয়েছে। এপিকিউরাস ও লুক্রেসিয়াসের গ্রন্থভাগ্য আরও মনে করিয়ে দেয় যে চার্বাকের ভাগ্যের জোর বোধহয় আরও কম ছিল। যে সব “ধর্মপ্ৰাণ” দার্শনিকরা চাৰ্বাককে খণ্ডন না করে জলস্পর্শ করতেন না তাদের বা তাদের মুরুব্বিদের রোষানলে চার্বাক-দর্শনের সকল পাণ্ডুলিপিও হয়তো অক্ষয় সদগতি লাভ করেছে!


মার্কসীয় দর্শনের আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা যে এপিকিউরাসের প্রসঙ্গ মুখ-বন্ধ রূপে উত্থাপন করলাম তার তাৎপৰ্য বুঝতে পাঠকদের বোধ হয় বেগ পেতে হয়নি। মার্কসীয় দর্শনের বিরুদ্ধে ধৰ্মধ্বজীদের আক্রমণের লক্ষ্য মূলত তার তথাকখিত। “জড়বাদ” নয়। এই দর্শনের মর্মনিহিত মানবতাবাদই এ আক্রমণের লক্ষ্যস্থল। কিন্তু মানুষকে স্ব-মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করার কাজে এ দর্শন এতখানি সাফল্য অর্জন করেছে এবং এই অনাস্বাদিত-পূর্ব সাফল্য সমগ্ৰ মানবসমাজে এত বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, মানুষের চিন্তাধারাকে এমন এক নূতন খাতে প্রবাহিত করেছে যে এই দর্শনকে নিছক ‘জড়বাদ” বলে আক্রমণ করলে চিন্তাশীল মানুষের সাধুবাদ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। যে দৰ্শন মানুষকে জড়পদাৰ্থ বলে মনে করে না, কিন্তু জড়পদার্থেয় উপর মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করে, তার বিরুদ্ধে জড়বাদের কুৎসা আর কতদিন চালানো সম্ভব? কাজেই এখন ঠিক উল্টে দিক থেকে আক্রমণ চালানো দরকার হয়ে পড়েছে,–“মার্কসীয় দর্শন বড় বেশী মানবিক; কারণ মানুষের প্রয়োজনের কল্পনা দিয়ে সত্যকে সাজিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে।”


অবশ্য রাসেল কোন কুটিল অভিপ্ৰায় নিয়ে এ আপত্তি তোলেন নি। তাঁর মতে মানুষের শুভাশুভ বিচার নৈতিক দর্শনের সমস্যা, আর জাগতিক সত্য সত্যের বিচার মানবকল্যাণ-নিরপেক্ষ বিশুদ্ধ দর্শনের সমস্যা। মার্কসবাদ এদুটাকে মিশিয়ে একাকার করে ফেলেছে। আমরা বিচার করব মার্কসবাদের বিরুদ্ধে রাসেল যে মৌলিক আপত্তি তুলেছেন তার বাস্তবিকই কোন ভিত্তি আছে কি না। কোন মার্কসবাদী কি এমন কথা কোনদিন বলেছেন। যে বস্তুজগতের সত্যাসত্য নির্ধারণ করা হবে মানুষের ভালমন্দের নিরিখে? রাসেলের মতে তা হলে মার্কসবাদও < এক ধরনের Pragmatic মতবাদ। একাধিক জায়গায় রাসেল বলেছেন যে আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির ফলে বিশ্বাসত্যের তুলনায় মানব-সত্যের মর্যাদা অনেকখানি হ্রাস পেয়েছে। নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক সত্যের প্রতিষ্ঠা মানুষের আত্মবলিয়কে সংকুচিত করেছে, “সবার উপরে মানুষ সত্য” এই আত্মপ্রসন্ন বিদগ্ধবাণীর ব্যর্থতা প্রমাণ করেছে, বস্তুজগতের তুলনায় মানুষের নগণ্যতাকে প্রকটিত করার মারফত তার স্বাতন্ত্র্যের গৌরব খর্ব করে দিয়েছে।


আমরা আগেই দেখেছি রাসেলের নিজের ঘাড়ে বার্কলি ও হিউমের প্ৰেতাত্মা এখনও ভর করে আছে, তার দার্শনিক যুক্তি অনুসারে ব্ৰহ্মাণ্ডটাই মানুষের মগজের ভিতরে ঢুকে গিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে, এবং সে মগজটাও যে আছে এমন কোন নিশ্চিত প্ৰমাণ পাওয়া দুষ্কর। রাসেলের নিজস্ব দর্শন আত্মকেন্দ্ৰিক নয়, কারণ আত্মা বলে কিছু নেই; মানবকেন্দ্ৰিক নয়, কারণ মানব বলে কিছু নেই এবং বস্তুতান্ত্রিক নয় কারণ বস্তু বলে কিছু নেই। অনুমেয় সত্য এই বহির্জগৎটাও আনুমানিক অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ। এই নিরালম্ব অনুভূতির ভৌতিক দীর্ঘনিঃশ্বাসকে এখন তিনি মার্কসের নাসিকাপ্রসূত বলে অনুভব করছেন। আবার অন্ধকার শ্মশানে অনেক সাহসী লোকও অনেক সমর্থ নিজের নিঃশ্বাসকে ভূতের নিঃশ্বাস বলে অনুভব করে।


“মানবকেন্দ্রিক” দর্শন কথাটির অর্থ কি? মানুষের বুদ্ধি ছাড়া মানুষ বস্তুসত্ত্বাকে জানবে কি করে? যে জগৎটা স্বাধীন ও স্বতন্ত্র, যার অস্তিত্ব মানুষের শুভাশুভ বিবেচনার উপর নির্ভর করে না তার রহস্য বুঝতে হ’লে কোন অতিমানবের কাছ থেকে মানুষ বুদ্ধি ধার করবে? অতীতের মৰ্কটকান্তি মানুষই এখন কাতিক-কান্তি হয়েছে সত্য, কিন্তু মৰ্কটের ধ্যানধারণা ধার করে মানুষের পক্ষে জগতের রহস্য ভেদ করা অসম্ভব। এ অর্থে তো সকল মতবাদই মানবকেন্দ্ৰিক, কারণ মানবীয় ভাবনা কেন্দ্রের বাহিরে গিয়ে মানবের পক্ষে কোন কিছু ভাবাই অসম্ভব। মানুষের বুদ্ধি দিয়েই “অ-মানুষে’র জ্ঞানলাভ করতে হয়- জ্ঞানের এই নীতি স্বতঃসিদ্ধ। একে অস্বীকার করলে বলতে হবে-পাথর জানতে চাইলে পাথর হতে হবে, এমিবার রহস্য জানতে চাইলে মানুষকে আগে এমিবা হতে হবে; নোড়ী কুকুরের ট্রাজেডি জানতে পারেন নি বলে যে কবিগুরু আক্ষেপ করেছেন তারও বোধহয় বলা উচিত ছিল—“হায়, আমি নোড়ী কুকুর হতে পারলাম না!” যদি ধরেও নেই যে পুরুষ বৈষ্ণবসাধককে যেমন গোপীপ্রেমের রহস্য বুঝতে গেলে গোপী হয়ে যেতে হয় মানুষকেও তেমনি এমিবা বা নেড়ীকুকুর হতে হবে, তাহলেও এই অ-মানুষ জীবের মর্মকথা কোনদিন প্ৰকাশ করা সম্ভব হবে না; কারণ প্ৰকাশ করবে তো মানুষ, তখন ত তাকে আবার মানবিক ভাবনারই আশ্রয় গ্ৰহণ করতে হবে।


কাজেই মানবিক ভাবনা দিয়েই মানবেতর বস্তু বা প্ৰাণীর কথা ভাবতে হবে, জানতে হবে-এ নীতি স্বতঃসিদ্ধ। এই স্বতঃসিদ্ধ নীতির সঙ্গে আরও একটি স্বতঃসিদ্ধ প্ৰতিজ্ঞা মেনে নিতে হবে।-“মানুষের ভাবনার বাহিরে একটা স্বতন্ত্র বস্তুজগৎ আছে বলেই মানুষ ভাবতে পারে।” বিশুদ্ধ দার্শনিক তৎক্ষণাৎ লাফ দিয়ে উঠবেন-এ নীতি দুটো তো পরস্পর বিরোধী হয়ে গেল। বিরোধ হলে কি করব? এ বিরোধটাও তাহলে দুনিয়ারই নীতি। এই বিরোধকে অতিক্রম করে বিশুদ্ধ দার্শনিক একবার ভাববার চেষ্টা করে। দেখুন না। তিনি কিছুই ভাবতে পারবেন না। শূন্যবিহারিণী ভাবনা শূন্যেই মিলিয়ে যাবে। প্রথম কথা, সকল ভাবনার আশ্রয়স্বরূপ অন্ততঃ একটা মস্তিষ্করূপী বস্তু চাই যার অস্তিত্ব আমার চিন্তার উপর নির্ভর করছে না, অথচ আমার চিন্তাই যার অস্তিত্বের উপর প্রতিক্ষণ নির্ভর কয়ে চলেছে।


দ্বিতীয়তঃ, আমার জ্ঞানের বিষয় হিসাবে গাছপালা চেয়ারটেবিল মানুষটেবিল মানুষ ইত্যাদি স্বতন্ত্র সত্যবস্তুসমূহ রয়েছে যাদের সম্পর্কে আমি জানি, যারা আমার জ্ঞানকে আকার দেয়ম রূপ দেয়, অর্থ দেয়। না হলে বলতে হয় দর্শনের কোন বিষয় নেই, দার্শনিক মানুষও নেই, শুধু দর্শনটাই আছে। অথবা যে দেখে সে নেই, যা দিয়ে দেখে সেই চোখটাও নেই, যা দেখে সেই বস্তুটিও নেই-তৰু শুধু দেখাটাই আছে। এই তবে দার্শনিকের দর্শন, পরমার্থদর্শন। আধুনিক কালে এই পরমার্থ-দর্শন প্রচার করেই নাকি দর্শনশাস্ত্রে বিপ্লব আনা হয়েছে, যখন দ্রষ্টাই নেই দ্রষ্টব্যও নেই, বইগুলোও নেই, তখন এই শূন্যময়ী বিপ্লবের বাণী প্রচার করার প্রয়োজন কি? প্রয়োজন বোধহয় একটা আছে, তবে সেটা একটু বেশি পারমার্থিক। এই মৌলিক বিপ্লবের মূল্য হিসাবে মোটা মাইমেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোটা পদ অলঙ্কত করা যায়-এই মূল্যবোধটা সব চেয়ে বাস্তব, সর্বশ্রেষ্ঠ পরমার্থ। শূন্য ভাবনার প্রস্তুতির জন্য একদিকে প্রয়োজন কোটি টাকার মঠ, অন্যদিকে প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে বিশ্বের সরস্বতী আরামে লয় পেতে পারেন।


বলাবাহুল্য, এই অতি আধুনিক অথচ অতি পুরাতন বিপ্লবী দর্শনের উপর মার্কসীয় দর্শনের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। “মানুষ নামে একজাতের জীব আছে, মানুষের বাইরে বস্তুজগৎ একটা আছে, এবং মানুষ তার আপনি বুদ্ধির দ্বারা এই বস্তুজগৎকে জানতে পারে”-মার্কসবাদের মতে এই স্বতঃসিদ্ধ নীতিসূত্ৰকে গ্ৰহণ না করে এক পা এগোবার জো নেই। যারা এই নীতিসূত্ৰকে অস্বীকার করে তারা নয় উন্মাদ, নয় ভণ্ড, নয় বিভ্রান্ত। তারা মাকড়সার মত আপনার জালে আপনি আবদ্ধ, তাদের দর্শন মানবকেন্দ্ৰিক নয়, কিন্তু শূন্যকেন্দ্রিক। এই মূলনীতি স্বীকার করার জন্য মার্কসীয় দর্শন যদি “মানবকেন্দ্ৰিক” হয়ে থাকে, তাতে দুঃখের কিছু নেই।


“বিরোধ” কথাটার মার্কসীয় দর্শনে প্রচুর ব্যবহার দেখা যায়। প্রচলিত ন্যায়শান্ত্রেও এর ব্যবহার নিতান্ত অপ্রচুর নয়। তবু এর অর্থ সম্পর্কে এই দুয়ের ধারণা স্বতন্ত্র। আমরা বৃত্ত ও বর্গক্ষেত্রের সংজ্ঞা জানি। এই সংজ্ঞানুসারে আমাদের দুটি পৃথক পৃথক ধারণা আছে। “বৃত্তাকার বৰ্গক্ষেত্ৰ” বলামাত্র আমরা বলি এটা স্ববিরোধী কথা। এর কারণ আমাদের পক্ষে বৃত্তাকার বর্গক্ষেত্রের ধারণা করাই অসম্ভব। এ জাতীয় বিরোধ জ্ঞানকেই অসম্ভব করে তোলে। কিন্তু আমার ধরুন যোগ ও বিয়োগ, গুণ ও ভাগ-এখানেও যুগল ধারণার মধ্যে বিরোধ আছে। তবু চার সংখ্যাটিকে আমরা দুই আর দুইয়ের যোগফল হিসাবেও ভাবতে পারি। আবার ছয় থেকে দুই-এর বিয়োগফল হিসাবেও ভাবতে পারি। চৌদ্দকে সাত দিয়ে ভাগ করে দুই পাওয়া, আর সাত ও দুই-এ গুণ করে চৌদ্দ পাওয়া মূলত একই প্রক্রিয়ার দুইটি বিপরীত বৈশিষ্ট্য; এখানে কিন্তু বিপরীতের বিরোধ বৃত্তাকার বর্গক্ষেত্রের মত জ্ঞানের বন্ধ্যান্ত্বে পরিণত হয় না; বরঞ্চ সংখ্যার প্রকৃতি ও প্ৰক্ৰিয়া সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে আরও স্বচ্ছ ও গভীর করে তোলে। আবার দেখুন, বনের গাছটা মিস্ত্রীর হাতে পড়ে টেবিল হয়ে গেল। বিশুদ্ধ ন্যায়ের অনুরাগী দার্শনিকরা কি তুমুল তর্ক তুললেন, টেবিলটা গাছ কিনা, গাছটাই টেবিল কিনা? কিন্তু সাধারণ মানুষ জানে গাছ আর টেবিল এক নয়, অথচ একও বটে। এখানে এই বিরোধ ও সমন্বয়কে একই সাথে মেনে না নিলে গাছের টেবিলে পরিণত হওয়ার কথা ভাবাই যায় না। কোনও ন্যায়শাস্ত্রীকে সস্তুষ্ট করার জন্য সত্যকে বিকৃত করা সম্ভব নয়। জগতে প্ৰতিমুহূর্তে এক বস্তু আর একবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। একের ভিতরে বহু বিপরীতের সমন্বয় ও বিরোধ একই সঙ্গে স্বীকার করতে না পারলে প্ৰতিক্ষণের এই পরিণাম বা পরিবর্তনের ধারণাই করা যেত না। সুতরাং এখানে বস্তুর অন্তনিহিত বিরোধ বস্তুর স্বরূপ সম্পর্কে আমাদের সত্যদৃষ্টিকে আরও গভীর ও প্রসারিত করে।


জ্ঞান ও জ্ঞেয়ের সম্বন্ধের ব্যাপারেও ঐ একই কথা সত্য। মানুষের মস্তিক্ষে প্রতিফলিত বহিঃসত্যকে মানুষ জানে। নিছক অনুভূতিবাদী দার্শনিক বলেন, তবেই হ’ল। জ্ঞানের পরিধির বাইরে গিয়ে কোন কিছুই যখন জানা সম্ভব নয়, তখন সবই আমার একান্ত অন্তরের ধন। কিন্তু একথা বলে অনুভূতিবাদী নিজের অন্তরেই বিরোধের পাকে জড়িয়ে পড়লেন। একই জ্ঞান, জ্ঞান ও জ্ঞেয়, এই দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল; একজন জ্ঞাত এনে যদি এখন হাজির করা যায়, তবে তো বিরোধটা আরও বেশী জমে উঠবে। মানুষের ধারণা জ্ঞেয় পদার্থটা জ্ঞানের বাইরে, জ্ঞান ও জ্ঞেয় একই পদার্থ নয়। কিন্তু বিজ্ঞানবাদী যদি জ্ঞেয়কে জ্ঞানের অন্তর্গত বলে মনে করেন, তবে নিজের অন্তরে বিপরীতের বিরোধ তাকে মেনেই নিতে হবে। যদি বিরোধটা মানতেই হল। তবে সাধারণ মানুষের ধারণা নিয়ে বহির্বস্তুকে বাহির বলেই মানতে আর আপত্তি করার কি আছে। আর একথাও খাটি সত্য যে তর্কের সময় অন্তরের ধন নিয়ে যিনি যতই মেতে উঠুন না কেন, প্রকৃত জীবনে নিজের বাইরে একটা বস্তুজগতের উপর অবিচল ও অকৃত্ৰিম বিশ্বাস নিয়ে না চললে তর্কের দিনটি পর্যন্ত তার পক্ষে বেঁচে থাকার সৌভাগ্যই হত না। যে বিশ্বাস ছাড়া এক পা ইটা ষায় না, এক মুহূর্ত বাঁচা ষায় না, তর্ক করার তাকত পাওয়া যায় না সে বিশ্বাসটাকে তর্কের খাতিরে উড়িয়ে দিতে হবে এমন আবদার করলে সে তার্কিককে গাছের ডালে চড়িয়ে দিয়ে বলতে হয়, একবার কালিদাস হোন, ডালটা কেটে দেখুন না কি হয়। সুতরাং অন্তর ও বাহির এই দুই ধারণা পরস্পরবিরোধী হলেও এই দুয়ের সমন্বয়েই আমাদের জ্ঞানের সৃষ্টি। একদিকে আমায় ইন্দ্ৰিয় স্নায়ু ও মস্তিষ্ক সমন্বিত দেহ আর একদিকে বাইরের বস্তুজগৎ-এই দুয়ের সম্পর্কের মারফত জ্ঞানের উৎপত্তি। এখানে ভিতর-বাইরের বিরোধটা “বৃত্তাকার বর্গক্ষেক্ষেত্রের” বিরোধ নয়। এইরূপে বিরোধ ও সমন্বেয়ের একই সঙ্গে ধারণা না থাকলে কোন বস্তুগত ধারণাই অসম্ভব। নিছক ভাববাদী দার্শনিকরা জ্ঞান ও জ্ঞেয়ের, অন্তর ও বাইরের বিরোধকে “বৃত্তাকার বর্গের” মতই মনে করেন। এই দুই ধরনের বিরোধকে একাকার করে দেখার ফলেই শংকরাচাৰ্য তার বেদান্তভাষ্য এই বলে আরম্ভ করলেন যে জ্ঞান ও জ্ঞেয় আলো ও অন্ধকারের মত পরস্পরবিরোধী। বিরোধ পরিহারের উপায়টিও সস্তা, জ্ঞেয় পদার্থকে বাদ দিলেই লেঠা চুকে গেল। তা হলে জ্ঞানের রূপ আকার প্রকার এসব কোথায় পাওয়া যাবে? বলা হল ওগুলোও মিথ্যা, এক নিরাকার জ্ঞানই অবিনশ্বর সত্য। মার্কসবাদী এখানে সবিনয়ে বলবে,–শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত যা ধারণা করতে পারে আপনি যদি তা না পারেন তবে আপনার ধারণার অক্ষমতাকে সম্মান দেখাবার জন্য পৃথিবীর সকল মানুষের ধারণা মুছে ফেলতে মায়ামোহগ্রস্ত জীবগুলো রয়েছে তাদের উদ্ধার করার জন্য আপনি ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন কেন? ব্রাহ্মণ্ডটা যখন আপনার ভিতরেই রয়েছে তখন আর আমাদের উদ্ধার করার জন্য বারে হাত বাড়াবার দরকার কি ছিল? যদি বলেন এসব কিছু করেছেন ব্যবহারিক সত্তার খাতিরে; তা হলে বলুন না কেন ব্যবহারিক সত্তাটাই সত্য; আপনার কল্পিত পারমার্থিক সত্তাটাই ভাববিলাস মাত্র? জগৎটা যদি রাজুতে সর্পভ্রমের মতই হবে, তবে উপমাটা তো আমরা একটু উল্টেও দেখতে পারি, দড়িটাই জগৎ আর সাপটাই ব্ৰহ্ম হোক না কেন? আর এটাই ঠিক হবে, কারণ এই বস্তুজগৎটার উপর দাঁড়িয়েই আপনি ব্ৰহ্মভাবে ভাবিত হয়েছেন।


।।আট।।


বস্তুজগতের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব যখন মার্কসবাদের একটি মূলসূত্র তখন আমাদের পূর্বালোচিত অর্থে মার্কসবাদকে নিশ্চয়ই “মানবকেন্দ্ৰিক” বলা যায় না। রাসেল শেষ পৰ্যন্ত যা বলতে চেয়েছেন তাতে মনে হয় মার্কসবাদ Pragmatic অর্থে মানবকেন্দ্রিক। কিন্তু এই ধরনের মন্তব্যের মুস্থিল হল এই যে মার্কসবাদী দার্শনিকরা সুস্পষ্ট ভাবে Pragmatic মতবাদকে আত্মকেন্দ্রিক বিজ্ঞানবাদ বা Subojective Idealism বলে ঘোষণা করেছেন। স্বয়ং লেনিনের এবিষয়ে একাধিক নিঃসঙ্কোচ বক্তব্য রয়েছে। তিনি বলেছেন যে, কোন বস্তু বা ধারণা আমাদের প্রয়োজন সাধন করে বলেই সত্য একথা ঠিক নয়, বরঞ্চ সত্য বলেই প্রয়োজন সাধন করতে পারে। এ কথাই ঠিক। আমরা আগেই বলেছি যে ব্যবহারিক প্রয়োগের দ্বারা কোন বস্তু বা ধারণাকে আমরা সত্য বলে জানতে পারি; কিন্তু এর দ্বারা আমরা বস্তুর অস্তিত্বটা তৈরী করছি না, সত্যের সৃষ্টি করছি না। এর অর্থ, আমরা জানি বলেই যে বস্তুটা আছে তা নয়, আছে বলেই তাকে জানি। একই কথা অন্যভাবে বলা যেতে পারে, বস্তুসত্য নিরপেক্ষ বা absolute, কিন্তু মার্কসের মতে সত্য আপেক্ষিক, আপেক্ষিক সত্য-মানেই তো pragmatic truth, যখন যে রকম ভাবলে, যে রকম করলে কাৰ্যসিদ্ধি হয় তখন তাই সত্য। এই অপব্যাখ্যার নাম স্বেচ্ছাকৃত বিকৃতি বা বুদ্ধির অক্ষমতাজনিত বিভ্রান্তি। সত্যকে যখন আমরা আংশিকভাবে জানি তখনই আমাদের জ্ঞানটা আপেক্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই এই অর্থে কোন বস্তু বা ঘটনার অসম্পূর্ণ ধারণাকে আপেক্ষিক সত্যও বলা যেতে পারে।


আমাদের ধারণা সাধারণতঃ কোন বস্তুসত্তার আপেক্ষিক সত্যকেই প্ৰকাশ করতে পারে। এই টেবিলটার উদাহরণটাই ধরুন না কেন। যে কাঠুরিয়া বনের গাছটা কেটে তক্তা করেছে, যে মিস্ত্রী তক্তা দিয়ে টেবিলটা তৈরী করেছে-টেবিল সম্পর্কে তারা যা জানে আমি কিন্তু তার কিছুই জানি না। এখন কাঠুরিয়া, মিস্ত্রী ও আমার খণ্ড খণ্ড ধারণাগুলি মিলিয়ে টেবিলটাকে যেভাবে জানা যাবে, আমার চোখের দেখায়, বা উপরে কাগজ রেখে লেখায় কিন্তু সেই পরিপূর্ণ জ্ঞানের ভগ্নাংশ মাত্র পাওয়া যাবে। মার্কস ও হেগেলের পূর্ববর্তী সমস্ত দার্শনিকরাই জ্ঞান ও জ্ঞেয়র আলোচনা করতে গিয়ে মূলত: ইন্দ্ৰিয়লব্ধ জ্ঞানের বিচারপ্রসঙ্গেই সীমাবদ্ধ রয়েছেন—চোখের সামনে যে বইটা দেখছি ওর সঙ্গে আমার দেখা বা জানার সম্পর্ক কি, এই সমস্যা নিয়েই দর্শন দিশাহারা হয়েছে। কাজেই আমার ব্যক্তিগত ইন্দ্ৰিয়লব্ধ জ্ঞানটুকু যে বস্তুস্বরূপের একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশমাত্র প্রতিফলিত করে, আমার অগ্রবতী অভিজ্ঞতা এবং সমাজের, আরও দশজনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্য-বিধান করে আমাদের ধ্যানধারণা যে ক্রমশ: সমগ্ৰ বস্তুস্বরূপকে জানা ও বোঝার দিকে অগ্রসর হয়-জ্ঞানের এই ক্ৰমান্বয়ী অগ্ৰগতির দিকটা তারা বেমালুম পাশ কাটিয়ে চলে গেছেন। সামগ্রিকভাবে সামাজিক অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে অগ্রসর হতে না পারলে আমাদের খণ্ড খণ্ড জ্ঞানগুলি অন্ধের হাতি দেখারই সামিল। পূর্ণতা বা সমগ্রতাই সত্য–Truth is the whole-হেগেলের এই মতকে মার্কসবাদীরাও সত্য বলে মনে করেন। কোন বস্তুর সমগ্ৰ স্বরূপকে জানতে গেলে শেষ ধৰ্যন্ত বিশ্ব নিয়েই টান পড়ে। গাছটা ঠিক কি তা জামতে হলে গাছের উৎপত্তি ও পরিণতির সমগ্র ইতিহাস মিছিল করে মানুষের দরজায় হাজির হয়। বিজ্ঞানের সকল বিজুগ থেকে জ্ঞান সংগ্ৰহণ করতে হয়, সবকিছু মিলিয়ে একটা বিজ্ঞানসম্মত ধারণায় উপস্থিত হতে হয়। জ্ঞানটা তাহলে একদিনের ব্যাপার নয়, একজনের ব্যাপার নয়, বহুযুগের বহু মানুষের খণ্ডিত উদ্যোগ ও অভিজ্ঞতার সমন্বিত ফল হল সত্যের জ্ঞান। তথাপি এ জ্ঞান পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। কারণ অনেক রহস্য অনেকদিন ধরে অজ্ঞাত থেকে যাবে। মার্কসবাদ জ্ঞান ও জ্ঞেয়র সম্বন্ধকে পূর্ণতার দিকে অবিরাম অগ্ৰগতি হিসাবেই বিচার করে থাকে। এই অগ্রগতির বিরাম নেই, কারণ বিশ্বব্রহস্যের শেষ নেই। যা জানার তা জেনেছি, যা রোঝার তা বুঝেছি, যাকে জানলে সব জানা যায় সেই পরমপুরুষকে, জেনেছি—এমন কথ্য মানুষের পক্ষে বলা কোনদিন সম্ভব হবে না। যারা একদিন একথা বলেছেন তারা তাদের পথচারী পরিশ্রান্ত প্রজ্ঞার অক্ষমতাকে এক পরম্পুরুষ দিয়ে ঢেকে রেখে ক্লান্তি-জুড়ানো পরিতৃপ্তি নিয়ে ঘুমিয়ে শড়েছেন। সব জানা শেষ করে এই ঘুমিয়ে পড়াটাই যদি সার কথা হত। তবে পৃথিবীর বুকে আদিম মানুষের প্রথম পদধ্বনির কয়েক যুগ পরেই মানুষের সভ্যতাও হাওয়ায় মিলিয়ে যেত।


মানুষের শৈশব আছে, কৈশোর আছে, যৌবন আছে কিন্তু বাৰ্ধক্য নেই, কারণ তার জানার শেষ নেই। বিশ্বপ্রকৃতির পরিপূর্ণ সত্য চিরকাল মানুষের অগোচর থাকবে, কারণ সে সত্য স্বাধীন, স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ, মানুষের জানা অজানার উপর তা মোটেই নির্ভর করছে না, আর সেই জন্যই মানুষের সভ্যতা ও কোনদিন ঘুমিয়ে পড়বে না। মানুষের জ্ঞান আংশিক, আপেক্ষিক, তাই সে চরিকাল বাঁচবে। সকলের জ্ঞানকে একত্র করে আরও বেশী করে জানবে, অপূর্ণতাকে যতদূর সম্ভব পূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করবে। অনেক কিছুই অজানা থাকবে একথাও যেমন সত্য, আদিম মানুষের তুলনায় অনেক –বেশী জানা গেছে, আরও বেশী জানা যাবে একথাও তেমনি সত্য। বিশ্বপ্রকৃতির নিত্যনূতন রহস্য ভেদ করার মধ্যেই মানুষের অন্তহীন গৌরব। মার্কসবাদ এই গৌরবে বিশ্বাসী; এই জন্যই যদি তাকে “মানবকেন্দ্ৰিক” বলা যায় তবে এই মানবকেন্দ্রিকতা একনিষ্ঠ সত্যানুসন্ধিৎসার ছাড়পত্র। এই ছাড়পত্র যে দেশ পেয়েছে সেই দেশ সকলের আগে মহাকাশে পাড়ি জমিয়েছে। এমন একটা সমাজব্যবস্থা যদি গড়ে তোলা যায় যেখানে মানুষের লোভ মানুষের বাঁচার পথে অন্তরায় নয়, যেখানে সকলের সম্মিলিত জ্ঞানভাণ্ডারকে অবাধে পূর্ণসত্যের সাধনায় নিয়োজিত করা সম্ভব, তাহলে মানুষ যে অসাধ্যসাধন করতে পারে—তার প্রমাণ সোভিয়েট রাশিয়া। সাম্যবাদী দর্শনের মর্মকথা সোভিয়েত সমাজের ব্যবহারিক কর্মকাণ্ডে প্ৰযুক্ত হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে একথাও প্রমাণিত হয়েছে,–সাম্যবাদী দর্শন সত্যোলব্ধির দর্শন। এ দর্শন মানুষকে বাঁচতে শেখায়, সত্যকে জানতে শেখায়। কয়েক বছর আগে রাসেল বলেছিলেন-সোভিয়েত রাশিয়ার বৈপ্লবিক সাফল্য মার্কসবাদ ছাড়াও হতে পারত। ব্যাকরণের Subjunctive mood-টা বড় বেশী subjective। উত্তরে শুধু এটুকুই বলা চলে—যে দেশের চিন্তারাজ্যে Berkley, Hume ও Russell-এর নিরঙ্কুশ আধিপত্য সেই Newton-এর দেশে রাশিয়ার অনেক আগে মহাকাশ জয় করা যেত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad

Ads Section